তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০১৮, শুক্রবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

হাজী হুছেন আলী মোল্লা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসা

হাজী হুছেন আলী মোল্লা ও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসা
[ভালুকা ডট কম : ২৯ নভেম্বর]
সমাজে এমন কিছু মানুষ জন্ম গ্রহণ করে যাদের স্পর্শে সমাজ হয়ে উঠে আলোকিত।তাদের একজন হাজী হুছেন আলী মোল্লা।বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসার দাতা ও  প্রতিষ্ঠাতা হাজী হুছেন আলী মোল্লা কত সালে জন্ম গ্রহণ করেছেন তা সঠিক করে বলা না গেলেও জীবদ্দশায় তাঁর সঙ্গে আলাপ ও তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র আলহাজ আব্দুল বারীর সাথে কথা বলে জানতে পারি, বাংলা ১৩২৬ সালে ৩০ বছর বয়সে তিনি বিয়ে করেন। সে সুত্র অনুসারে ১৮৮৫-১৮৯০ সনে ময়মনসিংহ জেলার তৎকালীন গফরগাঁও থানাধীন দীঘা গ্রামে তিনি জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি এক মন ধান ৮/১০ আনা, এক সের দুধ ৩/৪ পয়সা, একটি লুঙ্গি ৮/১০ আনা এবং এক বান্ডিল ঢেউ টিন ৮/১০ টাকা দরে কিনেছেন। ১৩/১২/১৯৯৯ ইং দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় উল্লেখ করা হয়, হাজী হুছেন আলী মোল্লা নতুন শতাব্দিতে ১শ ১০ বছরে পা  রাখছেন। জীবদ্দশায় তিনি আট পুরুষ দেখে গেলেন। তিনি বাংলা ১৪০৭ সনের ৩০শে চৈত্র মৃত্যু বরন করেন।    

তিনি ১৯ শতাব্দির শুরুর দিকে ভালুকা থানার পাড়াগাঁও গ্রামে মাত্র পাঁচ একর জমি কিনে বসবাস শুরু করেন। ৬ পুত্রের জনক ছিলেন তিনি, কোন মেয়ে সন্তান ছিলোনা তাঁর। মেয়ে সন্তান লাভের আশায় দ্বিতীয় বার বিয়ে করলেও দ্বিতীয় স্ত্রী কন্যা সন্তান জন্ম  দেয়ার সময় মারা যান। তাঁর জীবনে জটিল কোন রোগ হয়নি।
          
তাঁর মুখে শুনেছি, তিনি কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেননা। একে ফজলুল হককে তাঁর খুব ভালো লাগতো। তাঁর সভা সমিতি হলে ভাষণ শুনতে যেতেন। গফরগাঁওয়ের পাঁচবাগী সাহেব তাঁর বন্ধু ছিলেন। অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন বড় বড় আলেমদের সাথে। তাকে শেষ বয়সে সংসার নিয়ে তেমন  ভাবতে দেখিনি। অধিকাংশ সময় কাটাতেন মসজিদে বসে। মাঝে মধ্যে সম বয়স্কদের কথা মনে হলে পায়ে হেঁটেই ছুটে যেতেন হাট বাজারে। তিনি বলতেন, আমার আমলের কেউ নেই ,এ আমলে আমাকে মানায়না। নতুন প্রজন্মকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলা, সৎ ভাবে জীবন যাপন করা ও ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করার আহবান জানাতেন।  

এলাকায় শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সেবার লক্ষে বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসা সহ প্রাথমিক বিদ্যালয়, হাফিজিয়া মাদরাসা, মসজিদ, ঈদগাহ মাঠ ও গোরস্থানের নামে প্রায় ৮ একর জমি দান করে তিনি একটি কমপ্লেক্স নির্মাণ করে গেছেন।   
            
তিনি দ্বীনি শিক্ষা বিস্তারের লক্ষে এক একর জমি দান করে ১/১/১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠা করেন। নানা প্রতিবন্ধকতা উপেক্ষা করে প্রতিষ্ঠানটি ১/১/১৯৯৮ সালে পাঠদানের অনুমতি, ১/১/২০০১ সালে একাডেমিক স্বীকৃতি ও ১/৫/২০০২ সালে এমপিও ভুক্ত হয়। এক্ষেত্রে উল্লেখ করা প্রয়োজন তার বড় ছেলে আলহাজ আব্দুল বারীর এক সময়ের ছাত্র প্রাক্তন যুগ্ম সচিব আবদুল আজিজ একাডেমিক স্বীকৃতি লাভের ব্যাপারে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করেন। একাডিক স্বীকৃতি বিষয়ে বড় ছেলে আব্দুল বারীকে একদিন তিনি কাছে ডেকে বললেন, তুইতো বলতি তোর এক ছাত্র অনেক বড় চাকরি করে, একবার তার কাছে গিয়ে দেখলে কেমন হয়? আব্দুল বারী পিতার আদেশকে উপেক্ষা না করে ছুটে গেলেন তাঁর সেই ছাত্রের কাছে। প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষককে মর্যাদা জানাতে সামান্য কুন্ঠাবোধ করেননি সচিব মহোদয়। তিনি সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে খুব দ্রুত একাডেমিক স্বীকৃতি লাভের সমস্ত কাজ সম্পন্ন করে স্বীকৃতি পত্রটি শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলেছিলেন, স্যার আপনি খুশি হয়েছেন? এবার আমার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করুন। শিক্ষক তাকে আশীর্বাদ করে বুকে টেনে নিলেন। তাঁর এ ঋণ কোনদিন শোধ করার নয়।    
 
মাদরাসাটি শুরু থেকে অধ্যাবধি সন্তোষজনক ফলাফল উপহার দিয়ে আসছে। বোর্ড মেধা তালিকা ও দাখিল পরীক্ষায় শতভাগ পাশ করার মতো ফলাফলের পাশাপাশি জেডিসি ও ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনি পরীক্ষায়ও আশাব্যঞ্জক ফলাফল অর্জন করে অত্র এলাকার শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপিঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। ২০০৬ ও ২০০৮ সালে দাখিল পরীক্ষায় মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডে মেধা স্থান অর্জন, ২০০৪ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত শতভাগ পাশ, জেডিসি পরীক্ষায় যথাক্রমে-২০১০সনে ২জন, ২০১১ সনে ০১ জন বৃত্তি এবং ইবতেদায়ী শিক্ষা সমাপনি পরীক্ষা ২০১০ সনে ৪ জন উপজেলা মেধা তালিকা ভুক্ত হয়।তারই ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রেখে সর্বশেষ ২১০৩ সালের দাখিল পরীক্ষাতেও শতভাগ ফলাফল উপহার দিতে সক্ষম হয়। ভালুকা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ সাইফুল ইসলাম বিগত ফলাফল প্রসংগে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন,মান সম্মত শিক্ষা ও শিক্ষক কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে প্রতিষ্ঠানটি ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। আশা করি এ ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকবে। তিনি ম্যানেজিং কমিটির সকল সদস্য ও শিক্ষক কর্মচারীদের অভিনন্দন জানান।      
 
গতানুগতিক শিক্ষা ব্যবস্থার সার্টিফিকেট দিয়ে আত্মতৃপ্তিই পাওয়া যায় মাত্র, বর্তমানে সেই পাঠ্যপুস্তুকলব্ধ জ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকলে তথ্য প্রযুক্তির এই দিনে টিকে থাকা বড়ই কঠিন। তাই কম্পিউটার শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর দোর গোড়ায় পৌঁছে দিতে ০১/০১/২০০৭ সালে  প্রতিষ্ঠানটি কম্পিউটার শিক্ষা দানের অনুমতি লাভ করে। বর্তমান যুগ বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞানের আলোকে সারা বিশ্ব আলোকিত। বিজ্ঞান ছাড়া বর্তমান সভ্যতা কল্পনা করা যায়না। মাদরাসা শিক্ষাকে বিজ্ঞানমুখী করার লক্ষে ১/১/২০০৯ সালে বিজ্ঞান বিভাগ খোলার মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবী পূরণ করা হয়।  

মান সম্মত শিক্ষা ও আশা ব্যঞ্জক ফলাফলে মুগ্ধ হয়ে রানার অটোমোবাইলস লিঃ ২০১৩ সাল থেকে কৃতি ছাত্র-ছাত্রিদের মধ্যে বৃত্তি প্রদান শুরু করে। তার মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুন দিগন্তের সূচনা । প্রতিমাসে ১ম শ্রেণি হতে ১০ম শ্রেণির মেধাবী শিক্ষার্থীদের হাতে পাঁচ শত টাকা থেকে শুরু করে একহাজার টাকা ও শিক্ষা উপকরণ তুলে দেয়ায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে  প্রাণচাঞ্চল্য ও প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব সৃষ্টি হয়েছে।     

সুপারিনটেনন্ডেন্ট শেখ খাইরুল বাশারের সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯ জন শিক্ষক কর্মচারী আন্তরিকতার সাথে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাছাড়া সুদক্ষ মাদরাসা পরিচালনা কমিটির সার্বক্ষণিক নজরদারি ও সহযোগিতার ফলে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম হয়েছে গতিশীল ও প্রাণবন্ত। অত্র এলাকার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও শিক্ষানুরাগী আলহাজ শাহাবউদ্দিন তালুকদার অত্র পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর গঠনমূলক  সিদ্ধান্ত ও দিক নির্দেশনা মাদরাসার সার্বিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে।মাদরাসার ম্যানেজিং কমিটি, অভিভাবক ও সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানটি মানুষের হৃদয় জয় করে নিয়েছে।
       
স্বাস্থ্য রক্ষায় খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের প্রয়োজনীয়তা খুব বেশী। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও শিক্ষা সফর ছাত্র ছাত্রীদের একঘেয়েমি দূর করে জীবনকে আনন্দমুখর ও উপভোগ্য করে তুলেছে।আজ হাজী হুছেন আলী মোল্লা আমাদের মাঝে নেই কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকর্ম আমাদের মাঝে বেঁচে আছে। তিনি আমাদের প্রতিদিনকার সাথী,অস্তিত্বের অংশ, আমাদের চেতনায় চিরজাগ্রত।   
                                                                                                      
লেখক
মোঃ  সফিউল্লাহ লিটন
সহকারী শিক্ষক
বড়চালা হুসাইনিয়া দাখিল মাদরাসা






সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

ব্যাক্তিত্ব বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫২৪ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই