তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

মেজর আফসার উদ্দিন আহম্মেদ

মেজর আফসার উদ্দিন আহম্মেদ ও মুক্তিযুদ্ধে আফসার বাহিনী
[ ভালুকা ডট কম : ২০ জুন]
আমাদের  মহান  মুক্তি যুদ্ধে  দক্ষিণ ময়মনসিংহের  পাহাড়ী এলাকায় প্রতিষ্ঠিত হয় অনিয়মিত আফসার বাহিনী। দক্ষিণ ময়মনসিংহের ভালূকা, ত্রিশাল, ফুলবাড়ীয়া  ও গফরগাঁও টাঙ্গাইল জেলার কালিহাতী , ঘাটাইল ও সখিপুর বর্তমান গাজীপুর জেলার শ্রীপুর ও কালিয়াকৈর থানাএলাকা ছিল আফসার বাহিনী যুদ্ধএলাকা ।

১৯৭১ সনে  ৭ই মার্চ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ঘোষণাকে ধারণ করে   তৎকালীন ভালুকা থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আফসার উদ্দিন আহমেদ ভালুকা থানার রাজৈ ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা আব্দুল হামিদ মেম্বারের একটি রাইফেল সংগ্রহ করে ৮জন সদস্য নিয়ে ২৩শে এপ্রিল/৭১ইং তারিখ  অত্র থানার নিবৃত পল্লী মল্লিকবাড়ী বাজারে গঠন করেন মুক্তিবাহিনী। এই বাহিনী একাধিকবার  ভালুকা থানায় অভিযান চালিয়ে পুলিশের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র  ও গোলাবারুদ উদ্ধার  করে। এছাড়া ও বিভিন্ন স্থান  হতে তৎকালীন বাঙ্গালী ই . পি. আর আনসারদের ফেলে যাওয়া অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার  করে আফসার বাহিনী।  সদস্য সংগ্রহ করে আফসার উদ্দিন আহমেদ বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।এ ক পর্যায়ে আফসার বাহিনীর সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় সারে চার হাজার । বৃটিশ ভারত সেনা বাহিনীর (অবসরপ্রাপ্ত) সুবেদার মেজর , আফসার উদ্দিন আহমেদ, তার বাহিনীকে সামরিক বাহিনীর নীতিমালা অনুযায়ী ৫ টি ব্যাটালিয়ানে ভাগ করে প্রতি ব্যাটেলিয়ানে ৫টি করে কোম্পানী প্রতি কোম্পানীতে ৩টি করে প্লাটন প্রতি প্লাটনে ৩টি করে সেকশান প্রতি সেকশানে ১৫ জন করে অস্ত্রধারী মুক্তিসেনা ছিল।স্বহস্তে প্রতিষ্ঠিত আফসার বাহিনীর প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে শেষ পর্যন্ত আফসার উদ্দিন আহমেদ বীরত্বের সাথে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শপথ করে বলেছিলেন আমার মৃত্যু হলে যেন  স্বাধীন বাংলার মাটিতেই হয়্  দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত  এই  অস্ত্র ত্যাগ করবো না এবং কারো সাথে কোন  প্রকার  আপোষ করবো না। অফসার উদ্দিন আহমেদ  তার এই শপথ  রক্ষা করেছেন সাহসিকতার সাথে।

বাংলাদেশ দলিলের ষষ্ঠ ও নবম খন্ডে উল্লেখ করা হয় ১৯৭১ সনে ২৫ শে মার্চ কালো রাতে পাক হানাদার বাহিনী যখন ঢাকায় ঘুমন্ত মানুষের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়, যখন লাখ লাখ বাঙ্গালীকে হত্যা করা হয়, যখন দেশের রাজনৈতিক নেতাসহ সর্ব স্তরের লাখ লাখ মানুষ পুতিবেশী বন্ধুরাষ্ট্র  ভারতে আশ্রয় নিচ্ছে, ঠিক সেই মুহূর্তে  ভালুকা থানা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আফসার উদ্দিন তৎকানি স্বাধীন বাংলা সরকার ও ভারত সরকারের কোন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই দেশের অভ্যন্তরে ভালুকা থানার মল্লিকবাড়ী বাজারে তার বাহিনীকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। দলিলে আরো উল্লেখ করা হয় যুদ্ধচলাকালীন সময়ে স্বাধীন বাংলা সরকার সুষ্ঠুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার জন্য দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে। এ ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নিজস্ব উদ্যোগে দেশের ভিতরে যে কটি অনিয়মিত বাহিনী গড়ে উঠে তার মধ্যে ময়মনসিংহের আফসার বাহিনী অন্যতম।

আফসার বাহিনীর উল্লেখ যোগ্য যুদ্ধ ছিল ভালুকা থানাধীন ভাওয়ালিয়াবাজু যুদ্ধ। ২৫ জুন ১৯৭১। পাকবাহিনী সড়ক পথে গফরগাঁও থেকে ভালুকা আসার পথে আফসার বাহিনী বাধা দিলে ভাওয়ালিয়াবাজু নামক স্থানে যুদ্ধ বাধে। এক টানা ৪৮ ঘন্টা যুদ্ধ চলারপর পাক বাহিনীর অবস্থানে দুটি হেলিকাপ্টার থেকে মুক্তি বাহিনীর অবস্থানে পিছনে ( ধলিয়া উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে) ছত্রিসেনা অবতরণ করায় । এই যুদ্ধে আফসার বাহিনীর তরুণ মুক্তি সেনা ৮ম শ্রেনীর ছাত্র আঃ মান্নান শহীদ হন। এই যুদ্ধে ৯৫জন পাক সেনা নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়। আফসার বাহিনীর এই একটানা ৪৮ ঘন্টার যুদ্ধের খবর তৎকালিন স্বাধীন বাংলা বেতার, বিবিসি ও  আকাশবানী থেকে ফলাও করে প্রচার করা হয়। ঢাকা বেতার অবশ্য এই যুদ্ধের খবর পাক বাহিনীর পক্ষে প্রচার করে ছিল। এই যুদ্ধে অধিনায়ক আফসার উদ্দিন আহম্মেদ নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

এছাড়াও ট্ঙ্গাাইলের বল্লা এক টানা ৩ ঘন্টা যুদ্ধ ও গাজীপুর জেলার কালিয়াকৈর উপজেলার ফুল বাড়িয়া বাজারে পাক বাহিনীর সাথে একটানা ১৮ ঘন্টা যুদ্ধ সহ এই অঞ্চলে প্রায় দেড় শতাধিক সফল যুদ্ধ পরিচালা করে শত শত পাক ও রাজাকার বাহিনীর সদস্যদেরকে নিহত ও আত্ন সমর্থনে বাধ্য করেন। এসব যুদ্ধে আফসার বাহিনীর ৪০ জনের বেশী সাহসি মুক্তি সেনা শাহাদাদত বরণ করেন। শহীদদের মাঝে অধিনায়ক আফসার উদ্দিন আহম্মেদের ৩য় পুত্র ৭ম শ্রেণীর ছাত্র নাজিম উদ্দিনও রয়েছে।

আফসার বাহিনী ঘোষিত  মুক্ত এলাকা ভালুকা , ত্রিশাল, ফুলবাড়িয়া, গফরগাঁও , কালিয়াকৈর, শ্রীপুর, কালিহাতি ও সখিপুর থানা এলাকার যেখানে পাকা ও রাজাকার বাহিনী প্রবেশকরেছে সেখানে মুক্তি সেনারা বাধা দিয়েছে। আফসার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা অধিনায়ক আফসার উদ্দিন আহম্মেদ ১৭ সেপ্টম্বর ১৯৭১ ভারতের আগড় তলায় হাপানিয়া ক্যাম্পে গিয়ে মেজর শফিউল্লাহর সাথে দেখা করে তার বাহিনীর কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করে এবং উনার মাধ্যমে ১১ নং সেক্টরে প্রধান মিত্র বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সানসিং বাবজির সাথে কথা বলেন ও সার্বিক সাহায্য সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে  তার ভূয়সী প্রসংশা করেন। এর পর মেজর আফসার তার বাহিনীর ৫৬৫জন মুক্তিসেনা ঢালু ক্যাম্পে পর্যায়ক্রমে প্রশিক্ষনের জন্য প্রেরণ করেন। যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে মেজর আফসাররের নেতৃত্বে এস এ কালামের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক জাগ্রত বাংলা পত্রিকা। বিভিন্ন যুদ্ধের সফলতার খবরাখবর প্রকাশ করে এই পত্রিকা মুক্তিকামী মানুষের কাছে বিতরণ করা হতো। এমনকি কৌশলে এই পত্রিকা পৌছে দেয়া হত পাকবাহিনীর ক্যাম্পে।

আফসার বাহিনীর মুক্তি সেনারা ৮ ডিসেম্বার ভালুকা ৯ ডিসেম্বার ত্রিশাল ও গফরগাঁও থানা সদর পাক ও রাজাকার বাহিনী মুক্ত করে ১০ ময়মনসিংহ ডিসেম্বর মুক্ত অভিযানে অংশ নেয় এবং ময়মনসিংহ মহিলা ক্যাডেট ( প্রাক্তন রাবেয়া গালর্স স্কুল) কলেজে ক্যাম্প স্থাপন করে।  দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সনে বাংলাদেশ সরকার অনিয়মিত আফসার বাহিনীকে ১১ নং সেক্টরে অন্তর্ভূক্ত করে এফ জে /১১ সাব সেক্টর হিসেবে ঘোষনা করে প্রশংসা পত্র প্রদান করেন।

মেজর আফসার উদ্দিন ১৯৭২ সনে ভালুকায় রেডক্রস পরিচালিত আফসার ব্যাটেলিয়ান স্মৃতি হাসপাতাল নামে একটি বিলাস বহুল আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার করেন। পরে দরিদ্র মানুষের সুচিকিৎসার্থে ভালুকা গফরগাঁও ও শ্রীপুর থানা এলাকায় আরও ৮ টি শাখা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করে। এসময় মেজর আফসার জাসদের রাজনীতিতে জড়িয়ে পরেন এবং ১৯৭৪ সনে জেলে চলে যান। একই বছর সকল শাখাসহ ভালুকা থেকে এই হাসপাতাল সরকার প্রত্যাহার করেন। ফলে এই এলাকার হাজার হাজার মানুষ উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়। এসময় মেজর আফসার তিন বছর কার বরণ করেন।

১৯৭২ সনে মেজর আফসার তার পুত্রের নামে মল্লিক বাড়ি জুনিয়র হাইসকুল কে শহীদ নাজিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় নামে প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি জেলা জাসদের প্রতিষ্ঠা সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৭৮ সনে জেলা জাসদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় গঠিত জাসদের সহযোগি সংগঠন মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রাম পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করে মেজর আফসার।  মেজর আফসার ১৯৯০সনে আওয়ামীলীগে যোগদান করে ঐ বছর আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটের ব্যবধানে ভালুকা উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

উপজেলা চেয়াম্যান থাকাকালে মেজর আফসার তার বাহিনীর ২৬জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে ভালুকা পুরাতন বাসস্ট্যান্ডত্ত্বরে নির্মাণ করেন মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধ এবং ভালুকা সদর সহ উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে ২৬ সড়কের নাম করণ করেন ২৬জন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে। দেশ প্রেমিক এই মুক্তিযোদ্ধা মেজর আফসার উদ্দিন আহম্মেদ ১৯৯৩ সনে ৬ সেপ্টেম্বর ৭১ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতী যতদিন থাকবে তত দিন আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর উদ্দিনের বীরত্বপূর্ন ইতিহাস জাতী শ্রদ্ধাভরে স্বরণ করবে। মেজর আফসার জাতীর গর্ব তথা দক্ষিণ ময়মনসিংহ বাসীর অহংকার। আমরাকি পারিনা ভালুকায় খিরু নদীর উপর নির্মানাধিন সেতুটির নাম বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর আফসার সেতু নাম করন করে এই বীর মুক্তিযোদ্ধার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে?





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

ব্যাক্তিত্ব বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৮৯ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই