তারিখ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮, বুধবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপে ব্যাহত হচ্ছে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম

তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপে ব্যাহত হচ্ছে তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম
[ভালুকা ডট কম : ০৫ সেপ্টেম্বর]
তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জনে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। সামগ্রিকভাবে, আর্টিক্যাল ৫.৩ এর নির্দেশনাবলী বাস্তবায়নে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচকে এশিয়ার দশটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে খারাপ (নবম)।  আজ ঢাকায় প্রকাশিত ‘তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ সূচক: এফসিটিসি আর্টিক্যাল ৫.৩ বাস্তবায়ন প্রতিবেদন, বাংলাদেশ ২০১৮’ গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে দেয়া বক্তব্যে মাননীয় মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি বলেন,গবেষণায় আজ যে তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেল, তা আমাদের ভবিষ্যত তামাক নিয়ন্ত্রণ পদক্ষেপ গ্রহণে কাজে লাগবে। এছাড়াও, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে আগামী বাজেটে মাননীয় অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে প্রয়োজনীয় রাজস্ব পদক্ষেপ (fiscal measures) নেয়া হবে বলে তিনি প্রতিশ্রুতি প্রদান করেন। গবেষণা ফলাফলে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের দুর্বল অবস্থানের অন্যতম কারণ হিসেবে অনুষ্ঠানের গেস্ট অব অনার সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)-তে সরকারের ১০.৮৫ শতাংশ শেয়ার থাকাকে দায়ি করেন। তিনি বলেন,বিএটিবির পরিচালনা পর্ষদের ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই বর্তমান ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। এভাবেই তামাক কোম্পানি হস্তক্ষেপ চালানোর সুযোগ পায়।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন,আমরা এফসিটিসি বাস্তবায়নে কেবল সমর্থনই করে যেতে চাই না, সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণও করতে চাই। এ ব্যাপারে আগের তুলনায় আমরা আরো বেশি শক্তিশালী অবস্থানে আছি। কারণ এফসিটিসি বাস্তবায়নের ব্যাপারে যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাজই হচ্ছে তা বাস্তবায়ন করা।

অনুষ্ঠানের সভাপতির বক্তব্যে আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন,গবেষণায় আর্টিকেল ৫.৩-এর আলোকে সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কোড-অব-কন্ডাক্ট তৈরি করার যে সুপারিশ এসেছে, সেটি আমাদের এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

অনুষ্ঠানে গবেষণার ফলাফল তুলে ধরার সময় হাসান শাহরিয়ার বলেন, বাংলাদেশ সরকারের তামাকবিরোধী নানাবিধ কার্যক্রমের ফলে ২০০৯ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে তামাকের ব্যবহার ১৮.৫% হ্রাস (Relative reduction) পেয়েছে। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে- গ্যাটস ২০১৭ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৫ বছরের উর্ধ্বে তামাক ব্যবহারকারীর হার ৩৫.৩%(৩ কোটি ৭৮ লক্ষ)। ২০০৯ সালে পরিচালিত প্রথম গ্যাটস জরিপে তামাক ব্যবহারকারীর এই হার ছিল ৪৩.৩% (৪ কোটি ১৩ লক্ষ)। তবে তামাক কোম্পানির বিদ্যমান হস্তক্ষেপ অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ অর্জন পিছিয়ে যেতে পারে।

গবেষণায়, বিগত দুইবছরে (২০১৬ ও ২১০৭) সরকার তামাক কোম্পানির নানাবিধ হস্তক্ষেপ কিভাবে আমলে নিয়েছে এবং জনস্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিভিন্ন নীতিমালা সুরক্ষায় কি ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তা মূল্যায়নের চেষ্টা করা হয়েছে। এধরনের গবেষণা বাংলাদেশে এটাই প্রথম। বাংলাদেশ সরকার ২০০৮ সালে এফসিটিসি আর্টিক্যাল ৫.৩ সংক্রান্ত গাইডলাইন গ্রহণ (adopt) করে, তবে এক দশক সময় অতিক্রান্ত হলেও এসংক্রান্ত কোন নীতিমালা প্রণয়ন করেনি। অথচ গাইডলাইন অনুসারে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকতে সরকার বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।=উল্লেখ্য, আর্টিক্যাল ৫.৩ একটি দেশের তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এবং নীতিসমূহ তামাক কোম্পানির ব্যবসায়িক ও অন্যান্য স্বার্থ হতে সুরক্ষা প্রদানের প্রধান হাতিয়ার। সুতরাং আর্টিক্যাল ৫.৩ বাস্তবায়নে সরকারের সমন্বিত প্রয়াস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গবেষণায় আর্টিক্যাল ৫.৩ সংক্রান্ত গাইডলাইন এর আলোকে Southeast Asia Tobacco Control Alliance (SEATCA) কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রশ্নাবলী ব্যবহার করে মোট সাতটি বিভাগে তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপ মূল্যায়ন করা হয়েছে।

গবেষণার সংক্ষিপ্ত ফলাফল:
* তামাক কর সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তামাক কোম্পানির অংশগ্রহণ পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন, জাতীয় বাজেট তৈরির সময় তামাকপণ্যে করারোপের ক্ষেত্রে তামাক কোম্পানিগুলোর সাথে বৈঠক করা হয়েছে। তামাক কোম্পানির সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের চূড়ান্ত বাজেটে বিড়ির ওপর প্রস্তাবিত সম্পূরক শুল্ক ৩৫% থেকে কমিয়ে ৩০% নির্ধারণ করা হয়েছে।
* বিভিন্ন সময় তামাক কোম্পানিকে নানাভাবে সুবিধা প্রদানের নজির গবেষণায় পাওয়া গেছে। যেমন, তামাক কোম্পানিগুলোর দাবি অনুযায়ী মোড়কের নিচের অংশে সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী মুদ্রণের অনুমতি প্রদান, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে অবস্থিত কোম্পানিকে তামাকজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আরোপিত ২৫% শুল্ক প্রদান থেকে অব্যাহতি প্রদান ইত্যাদি।
* তামাক কোম্পানির সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ তামাক নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত যেকোনো নীতি প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপের সুযোগ বৃদ্ধি করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কর প্রদান একটি আইনি বাধ্যবাধকতা হওয়া সত্ত্বেও এর জন্য তামাক কোম্পানিগুলোকে অনাবশ্যকভাবে পুরস্কার প্রদান করা হয়। ফলে, সরকারের নীতিনির্ধারকদের সাথে তামাক কোম্পানির নির্বাহী কর্মকর্তাদের যোগাযোগ তৈরি হয়।
* তামাক কোম্পানির সাথে সরকারের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকারের হাতে একটি তামাক কোম্পানির ১০.৮৫% শেয়ার থাকায় একইসাথে তামাক কোম্পানির ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং তামাক নিয়ন্ত্রণে অবদান রাখার ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান পরস্পরবিরোধী।
* তামাক কোম্পানির সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক কার্যক্রমে সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ রয়েছে। একটি তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার থাকায়, পদাধিকার বলে একাধিক মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উক্ত কোম্পানির সিএসআর কমিটির সদস্য। সিএসআর কার্যক্রম সরকারি কর্মকর্তাদের তামাক কোম্পানির কাজে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে।
* তামাক কোম্পানি বা এর প্রতিনিধিদের সাথে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়নি বলে গবেষণায় দেখা গেছে। স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণে তামাক কোম্পানি,  তামাক কোম্পানির সহযোগী সংস্থা এবং পক্ষভুক্ত লবিস্টদের পরিচয় প্রকাশ অথবা নিবন্ধন গ্রহণ অত্যাবশ্যক। তবে সরকারিভাবে এ সংক্রান্ত কোন নীতি এখনও গ্রহণ করা হয়নি।
* তামাক কোম্পানির হস্তক্ষেপমুক্ত থাকার জন্য আর্টিক্যাল ৫.৩ এর গাইডলাইনে বিভিন্ন সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলা হলেও এর বাস্তবায়ন এখনও হয়নি।
* তবে, FCTC Conference of Parties (COP) এবং এ সংশ্লিষ্ট কোন সভায় সরকারি প্রতিনিধি দলে তামাক কোম্পানির প্রতিনিধিত্ব পরিলক্ষিত হয়নি, যা প্রশংসনীয়।

গবেষণায়, তামাক কোম্পানির সাথে যোগাযোগ বা আলোচনার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য আর্টিক্যাল ৫.৩ এর গাইডলাইনের আলোকে ঈড়ফব-ড়ভ-ঈড়হফঁপঃ/নীতিমালা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়াও, তামাক কোম্পানির সাথে অপ্রয়োজনীয় যোগাযোগ বন্ধ করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য নীতিসমূহ সুরক্ষায় সকল যোগাযোগের তথ্য প্রকাশের জন্য সরকার কর্তৃক উদ্যোগ গ্রহণ, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব এড়াতে সরকারি কর্মকর্তাবৃন্দকে তামাক কোম্পানির পদ থেকে ইস্তফা দেয়া, রপ্তানি শুল্ক ও ভ্যাট অব্যাহতিসহ তামাক কোম্পানিকে প্রদত্ত সকল সুবিধা প্রত্যাহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান) এবং অ্যান্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স (আত্মা) যৌথভাবে আজ ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, বুধবার, সিরডাপ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স সেন্টারে এই গবেষণার ফল প্রকাশ অনুষ্ঠান আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবের হোসেন চৌধুরী এমপি, অনারারি প্রেসিডেন্ট, ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (আইপিইউ)।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. আবুল কালাম আজাদ, মুখ্য সমন্বয়ক (এসডিজি বিষয়ক), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় প্রাক্তন উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন ডা. মাহফুজুর রহমান ভুঁঞা, গ্রান্টস ম্যানেজার, ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস (সিটিএফকে) এবং ডা. সৈয়দ মাহফুজুল হক, ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। এছাড়াও অনুষ্ঠানে জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেল, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; ক্যাম্পেইন ফর টোব্যাকো ফ্রি কিডস; দি ইউনিয়নসহ তামাকবিরোধী সংগঠনসমূহের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। এটিএন বাংলার প্রধান প্রতিবেদক ও এন্টি টোব্যাকো মিডিয়া এলায়েন্স- আত্মা’র কো-কনভেনর নাদিরা কিরণ এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে গবেষণা ফলাফল উপস্থাপন করেন প্রজ্ঞা’র কো-অর্ডিনেটর মো: হাসান শাহরিয়ার।

বার্তা প্রেরক
মো: হাসান শাহরিয়ার,
কো-অর্ডিনেটর, প্রজ্ঞা





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

জাতীয় বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৩৭ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই