তারিখ : ২৬ মার্চ ২০১৯, মঙ্গলবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

লাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মইন আলী

লাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু মইন আলী,চায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা
[ভালুকা ডট কম : ০৫ ফেব্রুয়ারী]
লাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নওগাঁর রাণীনগরের মইন আলী। মানুষের মৃত্যুর পর কেউ সেই মরদেহটাকে আর চায় না। ভয়ে কাছেও যায় না কিন্তু মইন আলীই এক মাত্র মানুষ যে লাশের একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মাথায় সাদা টুপি আর পড়নে সাদা পাঞ্জাবী মইন আলীর।

রাত হোক আর দিন হোক লাশের খবর মইনের কাছে এলে সেই লাশ নিয়ে মর্গে যাওয়া আবার মর্গ থেকে কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া পর্যন্ত লাশের সঙ্গে থাকে এই মইন আলী। মইন আলী পেশায় একজন লাশ বহনকারী। কিন্তু ভালো নেই লাশের এই ঘনিষ্ঠ বন্ধু মইন আলী। স্থায়ী কোন সুযোগ-সুবিধা না পাওয়ায় মইন আলীর সংসার চলে জোড়াতালি দিয়ে। মানুষের অস্বাভাবিক মৃত্যুর খবরের অপেক্ষায় থাকতে হয় মইন আলীকে।

অভাব-অনাটনের সংসারে অনেক কষ্ট করেই কিনেছেন একটি ভটভটি। প্রায় ২/৩ বছর ধরে ভটভটি দিয়ে সড়কে যাত্রী বহনের কাজ করতেন তিনি। হঠাৎ এক দিন তার গ্রামের একটি লোকের অর্ধগলিত লাশ তার গাড়ীতে বাধ্য হয়ে বহন করতে হয়। লাশ বহনের পর মনের ভিতর জেগে যায় ধর্মীয় অনুভূতি, নামাজ পড়তে শুরু করলেন, মুখে দাড়ি রাখলেন মইন আলী। তখন তার মাথায় চিন্তা আসে যে, সবাই তো যাত্রী বহন করে, মরদেহ বহন করার লোক পাওয়া যায় না। লাশ নিয়ে পরিবারের লোকজনদের ও থানা পুলিশদের নানান বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। পঁচন ধরা অর্ধগলিত লাশ গাড়ীতে বহন করতে চায় না কেউ। প্রায় ১৪ বছর আগে মইন আলী সিদ্ধান্ত নেয় তিনি শুধুমাত্র লাশ বহন করবেন। তিনি থানা পুলিশকে বলেন, স্যার লাশ নিয়ে আপনাদের আর কোন সমস্যায় পড়তে হবে না। আমাকে খবর দিবেন, আমি লাশ বহনের জন্য চলে আসবো।

সেই থেকে রাণীনগর উপজেলায় ব্যক্তি পর্যায় ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে লাশ বহনের কাজটি মইন আলী কে দিয়েই চলছে। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ১ শ’ ১০ টি লাশ বহন করেছেন। অজ্ঞাত পঁচন ধরা ভাসমান দূর্গন্ধ হওয়া লাশ, রেল ও সড়ক দূর্ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত হওয়া, হত্যা-আত্মহত্যাসহ সব ধরণের লাশ কাপড় বা চাটা দিয়ে মোড়ানো ও বহনের ক্ষেত্রে মইন আলীই একমাত্র ভরসা সবার। লাশ বহন করতে পারলেই যেন তার মনে তৃপ্তি আসে। লাশ বহনের জন্য তিনি নিজেই তৈরি করেছেন সাদা পোষাক। ঘটনাস্থল যত দূরে ভাড়াটাও তত বেশি পাওয়া যায়। পঁচনশীল লাশের ক্ষেত্রেও ভাড়া খুব ভালই হয়। প্রায় দেড় থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত এক একটি লাশের ভাড়া হয়। এছাড়াও বিপদগ্রস্ত পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে লাশ বহনের মাধ্যমে এক রকম সহযোগিতাও করেন তিনি। এতে বিপদগ্রস্থ পরিবারের লোকজন তার প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন বলে মইন আলী জানান।

তিনি আরোও জানান, সব সময় লাশ পাওয়া যায় না। মাসে দু’একটি করে লাশের ভাড়া পাওয়া যায়। তাই অন্য সময় আমার গাড়ী দিয়ে যাত্রী বহন করতে গেলে ‘লাশের গাড়ী’ বলে গাড়ীতে কেউ উঠতেও চায় না। ফলে মাসের বেশির ভাগ দিন উপার্জন ছাড়াই বসে থাকতে হয়। শতাধিক লাশ বহন করাটায় তার জীবনের বড় সফলতা অর্জন বলে মনে করেন মইন আলী।

রাণীনগর উপজেলা সদরের সিম্বা গ্রামের মৃত-আশরাব আলী মন্ডলের ছোট ছেলে মইন আলী (৩৫)। বাবার মৃত্যুর পর চার ভাই-বোনের সংসার আলাদা হয়ে যায়। অভাবের সাথে যুদ্দ করে বেড়ে উঠা মইন আলী কিছুদিন পর বিয়ে করে নতুন জীবন শুরু করে। বছর কয়েক পর মইন আলীর অভাব-অনটনের সংসারে জন্ম নেয় এক মেয়ে ও পরে এক ছেলে। ভটভটি চালিয়ে মেয়েকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করিয়েছেন। ছেলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৪র্থ শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে। অভাবের সংসারে বেশি দূর পর্যন্ত লেখাপড়ার খরচ ব্যয় করা অসম্ভব। তাই বড় মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক বছর পর মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু বিয়ের খরচ বাবদ কোন টাকা পয়সা তার কাছে নেই, তাই টাকার প্রয়োজনে পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া জমিছ বিক্রি করে মেয়েকে বিয়ে দেয়। কিছুদিনের মধ্যে বিক্রি করা বসত ঘর ছেড়ে দিতে হয়। কোথায় থাকবে ? কি করবে ? এমন দূঃসময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য মো: ইসরাফিল আলমের ছোট ভাই সিরাজুল ইসলাম চাঁদের সরানাপন্ন হলে তিনি এলাকার ঝিনা গ্রামের পার্শ্বে গড়ে উঠা গুচ্ছগ্রামে তাকে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেন। সেই থেকে মইন আলী ওই গুচ্ছ গ্রামেই বসবাস করছেন।

রাণীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এএসএম সিদ্দিকুর রহমান বলেন, আমি এই থানায় আসার পর থেকেই দেখছি লাশ বহনের কাজ মইন আলীই করছে। শুনেছি সে দীর্ঘদিন ধরে এই কাজের সাথে জড়িত। থানায় মইনের মোবাইল নাম্বার রাখা আছে। যখন প্রয়োজন পড়ে তখন মইনকে ফোন করে ডেকে নেওয়া হয়। তবে তার জন্য স্থায়ী সুযোগ-সুবিধার জন্য কোন ব্যবস্থা করা যায় কিনা তা চেষ্টা করে দেখবো।#





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

লাইফস্টাইল বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৬০ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই