তারিখ : ২৪ মে ২০১৯, শুক্রবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

নওগাঁর পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল আবিস্কার

নওগাঁর পরিত্যাক্ত পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তেল আবিস্কার,সরকারি সহযোগীতা কামনা
[ভালুকা ডট কম : ২৮ ফেব্রুয়ারী]
মানুষের যান্ত্রিক জীবনে জায়গা দখল করেছে পলিথিন এবং প্লাস্টিক। পলিথিনের স্থায়ীত্ব বেশি। সহজে পচন এবং পুড়িয়ে ফেলা সম্ভব হয়না। বাজার করলেই সহজেই পলিথিনে বহন করা সম্ভব। কাজ শেষে পলিথিনকে ছুড়ে ফেলে দেয়া হয়। এরপর তার স্থান হয় ডাস্টবিনে এবং ময়লা আবর্জনার ফেলার স্থানে। তবে পরিত্যক্ত পলিথিনকে কাজে লাগিয়েছেন নওগাঁর মান্দা উপজেলার ৫৫ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী নামে এক ব্যক্তি। আর পলিথিনকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় কাজে লাগিয়ে তা থেকে তৈরী করেছেন জ্বালানি তেল পেট্রোল, ডিজেল, গ্যাস এবং ফটোকপি মেশিনের কালি।

ইদ্রিস আলীর বাড়ি উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামে। ১৯৮৫ সালে ৮ম শ্রেনী পাশ করেছেন তিনি। তবে দারিদ্রতার কারণে পড়াশুনার পাঠটি সেখানেই চুকিয়ে ফেলেছেন। এরপর জীবন সংগ্রামে নেমেছেন। নিজের জায়গা জমি বলতে কিছুই নাই। শ্বশুরের দেয়া সামান্য জমিতে মাটির বাড়ি। সংসারে পাঁচ ছেলেমেয়ে। তিন ছেলে ও দুই মেয়ে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেরা কৃষিসহ অন্যান্য কাজ করেন। আর স্ত্রী নূর জাহান বিবি একজন গৃহিনী। তিনি জীবিকা নির্বাহে কখনো ভ্যান চালিয়েছেন আবার কখনো কৃষিকাজ করেছেন। এছাড়া ইলেকট্রনিক মিস্ত্রি, সাইকেল মেরামতের মিস্ত্রির কাজও করেছেন। সর্বশেষ ভটভটি চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেছেন।

অল্প শিক্ষিত এ মানুষটি তার প্রতিভাবে কাজে লাগিয়ে তৈরী করেছেন জ্বালানি তেল এবং বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই ওয়েল্ডিং মেশিন বা ঝালাই মেশিন। তার এ প্রতিভাবে এক নজর দেখতে তার বাড়িতে ভীড় করছেন এলাকাবাসী। এলাকাজুড়ে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তবে সরকারি পৃষ্টপোষকতা পেলে তার এ প্রতিভাবে বিকশিত করা সম্ভব বলে মনে করছেন সচেতন এলাকাবাসী। পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল তৈরী করা হলে বাহির থেকে যেমন তেলের আমদানি কমবে। অপরদিকে ক্রেতারা সাশ্রয়ি মূল্যে তেল পাবেন। সেই সাথে চাহিদাও বৃদ্ধি পাবে।

পলিথিন থেকে শুধু জ্বালানি তেলই নয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয়ি ওয়েল্ডিং মেশিনও (ঝালাই মেশিন) তৈরী করছেন তিনি। ১২ ভোল্টের তিনটি ড্রাইসেল (শুষ্ক) ব্যাটারী দিয়ে তৈরী এ মেশিন দিয়ে প্রায় ৫০টি স্টিক ঝালাই করা সম্ভব। নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরী এ মেশিনটির খরচ পড়েছে প্রায় ৪২ হাজার টাকা।

প্রতিভাবান ইদ্রিস আলী বলেন, পরিত্যক্ত ও নোংরা পলিথিন থেকে জ্বালানি তেল তৈরী করা হচ্ছে এমন একটি ভিডিও তিনি ইউটিউব চ্যানেলে দেখেছেন। আর এ বিষয়টি তাকে গত তিন মাস থেকে ভাবাচ্ছে। এরপর ভাবনার বিষয়টি তিনি বাস্তবে রুপদান করেন। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা খরচ করে বাজার থেকে একটি টিনের তেলের বড় ড্রাম (ব্যারেল), একটি মাঝারি প্লাস্টিকের ড্রাম, ছোট দুইটি কন্টিনার, প্রায় ১৫ ফুট স্টিলের চিকন পাইপ, কয়েক হাত প্লাস্টিকের ফিতা কিনেন। এরপর থেকে জ্বালানি তেল তৈরী শুরু করেন।

তিনি বলেন, নোংরা ও পরিত্যাক্ত পলিথিন ১০ টাকা কেজি করে টুকাইদের কাছ থেকে কিনে নেন। এরপর বিশেষ প্রক্রিয়া পলিথিনগুলো টিনের ড্রামে ভরে প্রায় আধাঘন্টা ড্রামের নিচে খড়ি দিয়ে জ্বাল দেন। এরপর ড্রাম থেকে র্নিগত গ্যাস স্টিলের পাইপ দিয়ে এসে প্লাস্টিকের ড্রামের মধ্যে রাখা পানিতে ঠান্ডা হয়ে প্রেট্রোল এবং ডিজেল ছোট কন্টিনারে এসে জমা হচ্ছে। সাত কেজি পলিথিন থেকে প্রায় ৫ লিটার পেট্রোল জাতীয় পদার্থ, আধা লিটার ডিজেল বের করতে সক্ষম হয়েছি। তবে গ্যাস ধরে রাখার কোন ব্যবস্থা না থাকায় পুনরায় টিনের ড্রামের জ্বালানির কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর এ পেট্রোল দিয়ে ইতোমধ্যে মোটরসাইকেলে জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। তবে সবকিছু খরচ বাদ দিয়ে ৬০ টাকা লিটার হিসেবে বাজারজাত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। তবে দারিদ্রতার কারণে আধুনিক যন্ত্র কেনা সম্ভব হচ্ছেনা বলে মনে করেন। এজন্য সরকারের সহযোগীতা কামনা করেছেন।

স্থানীয় ফাইজুর হোসেন, নাজমুল হুদা ও চৌবাড়িয়া বাজারের হাবিবুর রহমান, রুবেল বাপ্পি সহ কয়েকজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, আমরা জানতাম পলিথিন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। কিন্তু এ পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল তৈরী করা হয় তা জানতাম না। পরিত্যাক্ত পলিথিন থেকে যে জ্বালানি তেল বের করা হচ্ছে তা স্ব-চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করতাম না। তবে আর্থিক দৈন্যতার কারণে তার এ পদ্ধতিকে প্রসার ঘটাতে পারছেন না। তার এ প্রতিভাবে বিকশিত করতে এবং উদ্ভাবনটির প্রসার ঘটাতে সরকারিভাবে সহোযোগীতা প্রয়োজন। সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আর্থিক ও সামাজিক উন্নয়ন সম্ভব। সেই সাথে এলাকায় বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ইদ্রিস আলী নামে ওই ব্যক্তির উদ্ভাবনটির কথা শুনেছি। তবে এর কার্যকারিতা কতটুকু ও পরিবেশ সম্মত কি না তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেনে পরবর্তি ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে। তার উদ্ভাবনি নমুনা আমরা কর্তৃপক্ষ বরাবর পাঠাবো। তবে আমরা স্থানীয় প্রশাসন তাকে স্বাগত জানাই। সেই সাথে তাকে পৃষ্ঠপোষকতার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

নওগাঁ সরকারি কলেজ রসায়ন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলালুর রহমান বলেন, পলিথিন এবং পেট্রোল, ডিজেল, কেরোসিন তেল, মবিল ও গ্যাসের মধ্যে একই উপাদান হাইড্রো কার্বন বিদ্যমান। পলিথিন হচ্ছে ইথিলিনের পলিমার। ছোট ছোট অনুকে একত্রে করে বড় করা হয়েছে। কার্বনের সংখ্যা যত কম হবে সেটা তত হালকা হবে এবং কার্বন সংখ্যা বেশি হলে যৌগ তত ভারী হবে। তবে পলিথিন পুড়িয়ে যে জ্বালানি বের করা হচ্ছে তা উচ্চতর পরীক্ষার প্রয়োজন।#





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

কৃষি/শিল্প বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৭৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই