তারিখ : ২৪ মে ২০১৯, শুক্রবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

বেনাপোলে নদী দখল করে প্রভাবশালীদের আলিশান বাড়ি

বেনাপোলে নদী দখল করে প্রভাবশালীদের আলিশান বাড়ি ও মাছের ঘের
[ভালুকা ডট কম : ২৩ এপ্রিল]
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সীমান্ত সংযোগ বেনাপোলের ‘হাকর নদী’ এখন ভূমিদস্যুদের দখলে। ভূমি জরিপের সময় দুর্নীতি বাজ সেটেলম্যান্ট কর্মকর্তা ও ভূমি অফিসের এক শ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তার জোগসাজশে নদীকে ‘সমতল ভূমি’ দেখিয়ে কৌশলে ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে দিয়েছেন এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। নদীর নাম হাকর নদী। হাকর নদী ভারত ও বাংলাদেশের দুটি অংশেই বিদ্যমান। ওপারের ইছামতি নদীর শাখা এই হাকর নদী।

১৯২৭ সালের রেকর্ডে নদীটির অস্তিত্ব মিললেও বর্তমানে নদীটির কোন খোঁজ মিলছে না। ব্যক্তি মালিকানায় দখল করে নদীর জায়গায় ভবন, মাছ চাষের ঘের ও পুকুর করা হয়েছে। তবে ভারতে নদীটির অস্তিত্ব রয়েছে। এ হাকর নদীতে এক সময় নিয়মিত জোয়ার ও জাহাজ চলাচল করতো। সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের দেখভাল না থাকার কারণে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে অবৈধ দখলদারদের মালিকানা স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছে। এখন আর জোয়ার নেই, চলেনা জাহাজ । প্রায় সাড়ে ৬ কিলোমিটার হাকর নদী জুড়ে ভূমিদস্যুরা আলিসান বাড়ি, মাছের ঘের ও ভেড়ি দিয়ে পুকুর তৈরি করায় পানি প্রবাহ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।

যশোরের সীমান্তবর্তী শার্শা উপজেলার বেনাপোলের সাদিপুর গ্রামে ভারত বাংলাদেশ সীমান্তের ১৮ নম্বর সীমানা পিলার এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকেছে হাকর নদী। শার্শার বড়আঁচড়া, ছোটআঁচড়া, ভবারবেড়, বেনাপোল ও নারানপুর মৌজার মধ্য দিয়ে রঘুনাথপুরের কোদলা নদী ও বুজতলার মধ্য দিয়ে শার্শা বেতনা নদীর সাথে মিশে গেছে। এ বেতনা নদীটি শার্শার নাভারন থেকে ১৯৬ কিলোমিটার দক্ষিনে মরিচাপ নদীতে মিশেছে। কিন্তু বর্তমানে বাংলাদেশের অংশে হাকর নদীর কোন অস্তিত্ব নেই। নদীর বুকে গড়ে উঠেছে একাধিক আলীশান ভবন ও নানা স্থাপনা। খনন করা হয়েছে অনেকগুলো পুকুর। ভারতের অংশে নদীটি এখনো বেঁচে আছে। জোয়ার ভাটা চলে নিয়মিত।

ওপারে ভারতের পেট্রাপোলে বাংলাদেশে প্রবেশমুখে বাঁধ দিয়ে পানি চলাচল নিয়ন্ত্রণে রেখেছে ওরা । বর্ষাকালে পানির চাপ হলে বাঁধ খুলে দেয়, তখন বেনাপোল সীমান্তের এপাশে ভারতীয় পানির চাপে প্রতিবছর বন্যার সৃষ্টি হয়ে এলাকার শতশত হেক্টর ফসলি জমির ফসল বিনষ্ট হয় বলছেন স্থানীয়রা ।

বেনাপোল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আবু সাঈদ মোল্যা বলেন, জমিদারি অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০-এর ২০ (২ক) ধারা মোতাবেক হাকর নদী সরকারের ১ নম্বর খতিয়ানে রেকর্ড না হয়ে তিন থেকে সাড়ে তিনশত ভূমিদস্যুরা কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে নদীর জমিকে সমতল ভূমি দেখিয়ে কৌশলে ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড করে নিয়েছেন। এ ব্যপারে বেনাপোল ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মোল্যা এক প্রশ্নে জবাবে বলেন, কুমুদিনী দাসী ও সূর্যকান্ত রায় চৌধুরী নামে দুইজন জমিদার হাকর নদীর জমির স্বত্ব দখলীয় হিসেবে ছিলেন। পরে এর স্বত্ব সরকারের কাছে চলে যায়। ১৯২৭ সালের সিএস রেকর্ডেও তা সরকারের নামেই ছিল। কিন্তু ১৯৬২ সালের এসএ জরিপে দেখা যায়, ছোটআঁচড়া মৌজার ১ নম্বর দাগে ৮ দশমিক ১৩ একর, বড়আঁচড়া মৌজার ১ নম্বর দাগের ৫ দশমিক ৬০, ভবারবেড় মৌজার ১ নম্বর দাগের ৪ দশমিক ২৩ ও বেনাপোল মৌজার ১, ৩৭২ ও ৪১১ নম্বর দাগে ২৪ দশমিক ৩৯ একর জমি বিভিন্ন ব্যক্তির নামে রেকর্ড হয়ে গেছে। এইভাবে স্থানীয় ৩০০-৩৫০ ব্যক্তি বর্তমানে নদীর জমি নিজেদের নামে রেকর্ড করে ভোগ-দখল করছেন।

বেনাপোল পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও লায়ন আলীকদর সাগর বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে হাকর নদীটি দখলমুক্ত করতে সরকারী প্রকল্প শুরু হলেও পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। সরকারের মন্ত্রী, এমপিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নদীটি দখলমুক্ত করে 'লেকসিটি' নির্মাণের পরিকল্পনায় কয়েক দফা পরিদর্শন করেছেন। তিনি আরও বলেন, স্থলবন্দর বেনাপোলের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নদীটি দখলমুক্ত করার বিকল্প নেই। আন্তঃসীমান্ত সংলগ্ন নদীটি দখলদারদের কারনে নাব্যতা হারিয়েছে। এতে পানি নিষ্কাসনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর শার্শা উপজেলার বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়ে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বেনাপোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলুর রহমান বলেন, স্থানীয় অনেক প্রভাবশালী অসৎ উপায়ে সিএস রেকর্ডের হাকর নদী সরকারি জমির মালিক হয়েছেন। এদের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। সিএস রেকর্ড অনুযায়ী হাকর নদী আবারো দখলমুক্ত করা হোক এ দাবি এখন বেনাপোলবাসীর। নাভারনের বেতনা নদীর সঙ্গে বেনাপোলের হাকর নদীর সংযোগ বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত পানির চাপে প্রতি বছর ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাঠের ফসল ও বাড়িঘর।

ভারত সীমান্ত থেকে বেনাপোল পৌর ভবন পর্যন্ত হাকর নদীকে দখলমুক্ত করে পৌরবাসীর জন্য একটি সরোবর (লেক) তৈরির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন বলেন, হাকর নদী উন্মুক্তকরণের জন্য মন্ত্রণালয়ের আদেশের অপেক্ষায় আছি। বর্ষা মৌসুমে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে শার্শার বাহাদুরপুরের বিপরীতে ভারতের শুটিয়ায় ফারাক্কার আদলে একটি বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। অতিরিক্ত পানির চাপ এলেই ভারত সেই বাঁধ খুলে দেয়। এতে বর্ষা মৌসুমে শার্শার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হচ্ছে।

শার্শা উপজেলা চেয়ারম্যান সিরাজুল হক মঞ্জু বলেন, বাংলাদেশ অংশে হাকর নদী অবৈধ দখলদারদের কব্জায় চলে গেছে। অথচ ভারতের অংশে নদীটি স্বাভাবিকভাবেই প্রবহমান আছে। সিএস রেকর্ডের মালিকানা ধরে নদীটি দখল মুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি।

শার্শা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মৌসুমী জেরিন কান্তা বলেন, অবৈধ দখলদারদের কারণে অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে হাকর নদী। নদীটি এখন নিখোঁজ বললেই চলে। সরকারি জমি কখনই ব্যক্তিমালিকানায় রেকর্ড হওয়ার সুযোগ নেই। তখনকার সময় সেটেলমেন্ট কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে বর্তমান দখলদাররা সম্পূর্ণ অবৈধভাবে নিজেদের নামে রেকর্ড করে নিয়েছে। হাকর নদী দখলমুক্ত করতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করা হয়েছে।

শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মন্ডল বলেন, হাকর নদীর দখলদারদের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। মামলার বিষয়েও খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। #





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৭৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই