তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

নওগাঁর ব্যতিক্রমী সাব্বীর আনসারীর জীবন যুদ্ধের গল্প

নওগাঁর ব্যতিক্রমী সাব্বীর আনসারীর জীবন যুদ্ধের গল্প
[ভালুকা ডট কম : ১৬ আগস্ট]
টিনসেডের ছোট্ট একটি দোকান ঘর। সেখানে কোন ভাবে ৬জন খদ্দের বসতে পারে। ওই দোকানে মাত্র ২০ বছর বয়সে বাবার সাথে তিনি নেমে পড়েন ব্যবসায়। ব্যবসা বলতে চায়ের ষ্টল। সাথে নিজ হাতে তৈরী করা রুটি আর ডাল। এই ছিল তার দোকনের খাবার মেনু।

সেই ২০বছরের যুবক এখন নওগাঁ জেলার শ্রেষ্ঠ হোটেল ব্যবসায়ী। তার সমান্তরাল এখনোও কেউ হয়ে উঠতে পারেনি। নওগাঁ শহরের আটাপট্টিতে সেই দোকান এখন পরিসর বাড়িয়ে নাম হয়েছে সাব্বীর হোটেল এন্ড রেষ্টুরেন্ট। তিনি এখন নওগাঁর একজন ব্যতিক্রমী মানুষ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।

মৃত-ইদ্রীস আনসারী ও সায়রুন নেছা দম্পতির বড় ছেলে সাব্বীর আনসারী। ভাই বোনের মধ্যে তিনিই বড়। ১৯৭৪ সালে বাবার সাথে সাব্বীর রুটি চায়ের দোকান শুরু করেন। দোকানে কর্মচারী বলতে ছিল সাইফুল নামের এক ছোট্ট বালক। সাব্বীর নিজ হাতে বাবার সহযোগিতায় রুটি ও চা তৈরী করে পরিবেশন করতেন। চায়ের কাপ, প্লেট, গ্লাস নিজ হতে পরিস্কার করতেন। এ ভাবে কেটে যায় ৬টি বছর। ১৯৮০ সালে এক ব্যবসায়ীর পরিবারের জন্য একদিন শখের বসে বাবার কাছে পরামর্শ নিয়ে পোলাও ও মুরগীর মাংস রান্না করেন। সে দিন ২কেজি আতব চাল ও ১০টি বাচ্চা মুরগী রান্না করেছিলেন। কোন কারনে সেই ব্যবসায়ী পরিবার ওই খাবারগুলো নিয়ে যায়নি। হঠাৎ সন্ধ্যার দিকে এলাকার মোস্তাক নামে এক যুবক ষ্টলে চা রুটি খেতে আসেন। পোলাও দেখে তিনি খেতে দিতে বলেন। সাব্বীর রান্না করা পোলাও ও মুরগীর মাংস তাকে খেতে দেন। মোস্তাক খেয়ে আবাক হয়ে যান। সেদিন তার জীবনের প্রথম খদ্দের মোস্তাকের কাছে হাফ প্লেট পোলাও ও হাফ প্লেট মুরগীর মাংসের দাম নিয়ে ছিলেন মাত্র ১৩টাকা। তখনও তিনি জানতেন না এই দামে তার পোশাবে কিনা। খাওয়া শেষে মোস্তাক দোকান থেকে চলে যান। এর কিছু সময় পরে তিনি তার আরো কয়েক জন বন্ধু নিয়ে ফিরে আসেন সাব্বিরে দোকানে। তাদের খেতে দেন সাব্বির। ওইদিন তাদের খাবার পর সব খাবার শেষ হয়ে যায়। সাব্বীর বুঝতে পারেন হয়ত এটিই তার জন্য অপেক্ষ করছিল।

পরদিন রুটির পাশাপাশি ৩কেজি আতব চালের পোলা ও ১২টি বাচ্চা মুরগী রান্না করেন। সেদিনও সব খাবার শেষ হয়ে যায়। অথচ তিনি জীবনে কোনদিন পোলা ও মাংস রান্নাই করেননি। প্রথম দিনের রান্না তিনি বাবার কাছে শিখে নিয়েছিলেন। এরপর তাকে আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজের হাতেই চলতো রান্না আর পরিবেশন। সাথে ওই ছোট্ট বালক সাইফুল। দোকানের পরিধি বেড়ে দাঁড়ালো ১২ আসনে। নিজ হাতে রান্না আর পরিবেশন করায় খুব অল্প দিনেই সাব্বীরের নাম ছড়িয়ে পড়ে শহরের আনাচে-কানাচে। দিন দিন খদ্দেরের সংখ্যা বাড়তে থাকে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেক খদ্দের ছোট্ট দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতেন কখন আসন ফাঁকা হবে সেই আশায়। মাঝে মাঝে বসা নিয়ে ছোটখাট তর্কবিতর্কের সূত্রপাত হতো। কৌশুলী সাব্বীর সেগুলো মিষ্টি কথা ও ব্যবহার দিয়ে সামাল দিতেন।

এখন সাব্বীরের পাঁচ তলা নিজস্ব ভবন জুড়ে হোটেলের সব আয়োজন। দোতলায় হোটেল, তিন তলায় কমিউনিটি সেন্টার, ৪র্থ তলায় ভাড়ার ঘর, ৫ম তলায় রান্নার ব্যবস্থা। এখন তার হোটেলে এক সাথে ৫৬ জন বসে খেতে পরে। ২০১২ সালে যুক্ত হয়েছে হরেক রকম মিষ্টান্ন সাথে আছে দৈ। ইতোমধ্যে তার দৈ ও মিষ্টান্নর নামও ছড়িয়ে পড়েছে। এই দোকানের নাম দিয়েছেন সাব্বীর সুইট মিট। তার রেষ্টুরেন্টে বর্তমানে নারী-পুরুষ কর্মচারী সংখ্যা ২০/২২জন। প্রতিদিন বাইরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার হোটেলের বিপুল পরিমান প্যাকেট খাবার সরবরাহ করা হয়। সরকারী ও বেসরকারী অফিসসহ কোন অনুষ্ঠানে বিশেষ খাবার মানেই হলো সাব্বীরের পোলাও/মাংস। সাব্বীর রমজান মাসে ইফতারের নানান পদের খাদ্যদ্রব্য তৈরী করে থাকেন।

সাব্বীর আনসারী বলেন এখনো আমি সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত হোটেলে শ্রম দিয়ে থাকি। এখন প্রয়োজনে নিজেই কর্মচারীদের সাথে হাতেহাত মিলিয়ে খাবর পরিবেশন করি। ২০১৮ সালে মান সম্মত খাবার ও পরিচ্ছন্নতার জন্য জেলার সেরা হোটেলের পুরস্কার পেয়েছি জেলা প্রশাসনের কাছ থেকে। তিনি কথা প্রসঙ্গে বলেন সততা, নিষ্টা ও পরিশ্রম আমাকে এতোটা পথ এগিয়ে দিয়েছে। আমার তিন ভাই আমার ব্যবসায় সহযোগিতা করে। আমার লেখাপড়া করার সুযোগ তেমন হয়নি। কিন্তু আমি আমার ছেলে মেয়েদের শিক্ষিত করে তোলার চেষ্টা করেছি। তারা আমার কথা রেখে পড়াশুনা করছে।

সাব্বীর আনসারীর স্ত্রী হামিদা খাতুন সার্বক্ষনিক স্বামীকে সাহস যুগিয়ে যান। ছেলে সবুর আনসারী সাগর সিলেট শাহজালাল প্রযুত্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাষ্টার্স শেষ করেছে। বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়ে সায়কা পাভীন এইচ এস সি পাস করেছে।

সাব্বীরে পোলাও, মিষ্টি ও দৈ শুধু নওগাঁ জেলায় সীমাবদ্ধ নয়। পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোতেও যায়। মিষ্টি দৈ ঢাকাতেও নিয়ে যান অনেকে।#





সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

লাইফস্টাইল বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৫৮৯ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই