তারিখ : ৩১ জুলাই ২০২১, শনিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

চলনবিল এখন ‘কোমায়’!অস্তিত্ব সংকটে ২২ খাল ৯৩ বিল

চলনবিল এখন ‘কোমায়’!অস্তিত্ব সংকটে ২২ খাল ৯৩ বিল
[ভালুকা ডট কম : ২০ এপ্রিল]
ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে চলনবিল। প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও নানা প্রতিকুল পরিবেশের কারণে পানিশূন্য হয়ে হ্রাস পাচ্ছে এর আয়তন। বিলের বুক ভেদ করে রেললাইন ও মহাসড়ক নির্মাণ করাসহ অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ, কালভার্ট, স্লুইসগেট, ক্রসবাঁধ ও বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের কারণে অস্তিত্ব হারাচ্ছে চলনবিল। শতবছরের বিবর্তনে ‘রত্নগর্ভা চলন্তবিলের’ ঐতিহ্যধারী চলনবিল আজ মরা বিলে রূপান্তরিত হচ্ছে। বাধাহীন দখল, অদুরদর্শী স্থাপনা, বেপরোয়া দুষণ ও  দ্রুত ভরাটের কারণেই এর আজ মরণদশা। এর প্রভাব পড়ছে পরিবেশসহ এ অঞ্চলের কৃষক, জেলে, ব্যবসায়ী ও জীববৈচিত্রের উপর।

সম্প্রতি সরেজমিনে চলনবিল দেখতে গেলে এর করুণ চিত্রই চোখে পড়ে।  বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলনবিল রক্ষ্ াকরতে হলে যমুনা ও পদ্মাসহ চলনবিলের প্রধান প্রধান নদ-নদী ও খাল-বিল ড্রেজিং এর আওতায় এনে পানির প্রবাহ সৃষ্টি ও পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। সারা বছর পানি থাকে এমন স্থানে মাছের অভয়াশ্রম করা সহ নদী দখল বন্ধ করে বেদখল হওয়া এলাকা উদ্ধার করতে হবে। বিলের অভ্যন্তরে প্রায় সহ¯্র উপবিল রয়েছে। এগুলোকে  ড্রেজিং করে মাছের অভয়াশ্রম তৈরি করার পাশাপাশি এর সংযুক্ত খালগুলোকে চালু করতে হবে। চলনবিলের রায়গঞ্জের নিমগাছিতে রয়েছে ‘নিমগাছি সমাজভিত্তিক মৎস্য চাষ প্রকল্প’ নামে সরকারি বৃহৎ হ্যাচারি সম্বলিত মৎস্য খামার। এখানে দেশি মাছের পোনা উৎপাদন করে ঐ অভয়াশ্রম গুলোতে মৌসুম অনুযায়ী অবমুক্ত করা সম্ভব হলে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই চলনবিলে হারিয়ে যাওয়া দেশি মাছের বৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা অনেকাংশেই সহজ হবে। চলনবিল বাঁচাতে হলে জন অংশ গ্রহনের ভিত্তিতে এর উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারী অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত সকল ব্রিজ, কালভার্ট, ক্রসবাঁধ, স্লুইসগেট অপসারণ করে নৌকা যাতায়াতের সুবিধা নিশ্চিত করে সেতুর উচ্চতা নির্ণয় করতে হবে। সর্বপরি তথাকথিত এমন কোন উন্নয়ন কাজ করা যাবে না যা চলনবিলের অস্তিত্বের জন্য ক্ষতিকর।

‘চলন্তবিল’ থেকে চলনবিল নামের উৎপত্তি। সম্ভবত চলনবিলই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ নদীমাতৃক জলাভূমি। মৎস্য ভান্ডার, শস্যভান্ডার ও প্রাকৃতিক রত্নভান্ডার হিসাবে খ্যাত, হাজারো অতিথি পাখির কলকাকলিতে মুখর, সবুজ-শ্যামলিমা ঘেরা নীল আকাশের বর্ণ প্রতিবিম্বিত জলে সূর্যের আলো প্রতিফলনে ঝলমলিয়ে ওঠা অপরূপ প্রাকৃতিক শোভামন্ডিত সুবিশাল জলাশয় চলনবিল। এর ভিতরে ছিল খরস্রােতা বহু নদ-নদী, খাল, বিল, উপবিল। ছিল ৪ হাজার ৭৮৬ হেক্টর আয়তন বিশিষ্ট ছোটবড় ৩২ টি নদী এবং ৩৬০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের ২২টি খাল। নদীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য- বড়াল, গুড়, গোহালা, করতোয়া, ভদ্রাবতী, বিলসূর্য, কুমারডাঙ্গা, ইছামতি, গুমানী, আত্রাই, নন্দকুজা, বেসানী, গাড়াদহ, কাকন-কানেশ্বরী, সরস্বতী, মুক্তাহার, ঝবঝবিয়া, নাগর, বানগঙ্গা, ভাদাই, গদাই, মুক্তাহার, শালিকা, কাটাগাঙ, তুলশী, চেচুয়া, খুবজিপুর, বারণী, ফুলজোড়, শুটকিদহ, গাইনগড়, রূপনাই নদী।  এনদীগুলোই ছিল চলনবিলের প্রাণ (হৃদ স্পন্দন)। এসব নদীর ছিল আরো অনেক শাখা প্রশাখা।

এ বিলের ৮টি উপজেলায়  রয়েছে ১ হাজার ৭৫৭ হেক্টর আয়তনের মোট ৯৩টি বিল। ফসলি জমির পরিমাণ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর (১৯৯০ সালের জরিপ মতে)। বিলগুলো হচ্ছে- সিংড়ায় ৫টি-কাউয়া টিকরি, দহিয়া, পদ্মাগাড়ি, সাতপুকুরিয়া, টেলিগ্রাম। গুরুদাসপুর ৩টি- চলন, চাকোল তেঙ্গরগাড়ি, হরিভাঙ্গা। চাটমোহর ২০টি- চৌয়ালদহ, খালশাগাড়ি, আফরা, নিমাইচড়া, ডাঙ্গাপাড়া, পিপরুল, কুড়ালিয়া, চিরল, দিকশি, গুড়কা, চাইয়ানীড়, কুক্সাগাড়ি, কাজিরনালা, নলডাঙ্গা, ধরইল, নবীন সুতিজলা, গৈরবিল, কেনুসরকারের জলা, বিল কুড়ালিয়া, রুহুল। ভাঙ্গুরা ১৮টি- শিউলি, বামুনগি, তেলকুপি, মধ্যবিলা, দিঘাপতিয়া, ছোট বিশ^কোল, কাদেরের জোলা, পাতিয়ার, পাকর, ফটিকের জোলা, ধরবিলা, আদুরি, বামন, পস্তিয়া, বর, হাতিগাড়া, পোয়াল, নলুয়ার বিল। ফরিদপুর ২টি-  গজনা, বড়া। শাহজাদপুর ৮টি- চরকাদাই, কাদাই, প্রাণদহ, মাথাভাঙ্গা, কারপাশা, চৌবাড়িয়া, বগাই, কৈজুড়ি। উল্লাপাড়া ২০টি - পুরুল, কলিয়া, গারবাড়ি, গজারিয়া, ধরইল, বাঘমারা, চকমেহেদী, মধুকোলা, আঠারপখি, নাটাগরি, কুবি, শৌলা, চেস্তা, চকচবিলা, চিলা, কৈরা, খারুয়া,  কচুলিয়া, মাটিকাটা, সুকলাই। রায়গঞ্জে ১৭টি-সারুটিয়া, দামরাই, নিঝুড়ি, দেবরাজপুর, গোরখাকালি, লক্ষ্মীকুতুব, কুরতা, কুরতা খাড়ি, লাঙ্গলমোড়া, মোরদিয়া, দশপাড়া, ধলজান, খাকরি, ধুবিল উত্তরপাড়া, চৌধুরী ঘুঘাট, বেতুয়া ।

চলনবিলে রয়েছে ২২টি খাল। খালগুলো হলো- নিমাইচড়া খাল, নিমাইচড়া-বেসানীর খাল, দোবিলা খাল, গাড়াবাড়ি-ছারুখালি খাল, গোহালার খাল, কিশোরখালি খাল, বেহুলার খাড়ি, বাকাই খাড়ি,  জানিগাছার জোলা, পানাউল্লার খাল, নেয়ামত খাল, নবীর হাজির জোলা, বেশানীর খাল, হক সাহেবের খাল, উলিপুর খাল, গুমানী খাল, কুমারভাঙ্গা খাল, গাড়াবাড়ি খাল, জানিগাছার জোলা, কিনু সরকারের ধর ও সাত্তার সাহেবের খাল, কাটাবাড়ী খাল। খালগুলো ১২ থেকে ২০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত দীর্ঘ।

সিরাজগঞ্জ, পাবনা, নাটোর ও নওগাঁ জেলার ১০ টি উপজেলা নিয়ে চলনবিলের বর্তমান অবস্থান। উপজেলা সমূহ যথাক্রমে-সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ, তাড়াশ, উল্লাপাড়া, পাবনার চাটমোহর, ভাংগুড়া, ফরিদপুর, নাটোরের গুরুদাসপুর, সিংড়া, বড়াইগ্রাম ও নওগাঁ জেলার আত্রাই। গ্রামের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার, লোকসংখ্যা- ৪৮ লাখের বেশি। কৃষি জমির পরিমাণ- ২ লাখ ৭৪ হাজার ৮০৭ হেক্টর (নয়টি উপজেলা)। পুকুরের সংখ্যা সরকারি-৪ হাজার ২টি, বেসরকারি পুকুর- ২৪ হাজার ২০১টি। =অতীতের চলনবিল ছিল ভয়ংকর বিশাল জলধি। ‘ইম্পেরিয়াল গেজেটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ ও ‘চলনবিলের ইতিকথা’  গ্রন্থ থেকে জানাযায়- আগে বিলটি বৃহত্তর পাবনা, রাজশাহী, নওগাঁ ও বগুড়া জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিরাজ করতো। পদ্মা তীরবর্তী লালপুর থানা ব্যাতীত তদানিন্তন নাটোর মহুকুমার সমগ্র অংশ চলনবিলময় ছিল। তখন বগুড়ার শেরপুর, নন্দীগ্রাম, পাবনার বেড়া, শাহজাদপুর (অংশ বিশেষ) ও নওগাঁর রাণীনগরসহ উল্লিখিত জেলা সমূহের মোট ১৪ টি থানাসহ পাশর্^বর্তী আরো ২০টি থানা এলাকায় চলনবিলের প্রভাব ছিল।  ১৯০৯ সালে পাবলিক ওয়ার্ক ডিপার্টমেন্টের জরিপ মতে প্রাচীন চলনবিলের আয়তন ছিল ১ হাজার ৮৫ বর্গ কিলোমিটার। খরা মৌসুমে শুকিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় ৩৬৮ কিলোমিটার্ ে১৯৪০ সালে পুর্ববঙ্গ রেলওয়ে প্রচার বিভাগের তথ্যমতে তখন এর আয়তন ছিল ৪৪১ বর্গ মাইল ( ৭০৫ দশমিক ৬ বর্গ কিলোমিটার)। ১৯১৪ সালে চলনবিলের মধ্য দিয়ে পুর্ব  থেকে পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ হতে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই বিলের অপেক্ষোকৃত উঁচু উত্তরাঞ্চল থেকে দক্ষিণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে ভাটা পড়ে। এরপর থেকেই চলনবিলের আয়তন সংকীর্ণ হতে শুরু করে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এরপর ২০০৩ সালে সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল থেকে নাটোরের বনপাড়া পর্যন্ত মহাসড়ক নির্মাণ করার পর পানির প্রবাহে আরো বেশি প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে অধিক পরিমাণ পলি জমে দ্রুত ভরাট হচ্ছে বিলের গভীরতা। আর নাব্যতা হারিয়ে শুকিয়ে সংকুচিত হচ্ছে বিলের আয়তন। জরিপে আরো দেখা গেছে বিলে পানি সরবর্হাকারী নদী দ্বারা বছরে প্রায় ৬ দশমিক ৩ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয়।  আর ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ঘনফুট পলি বিভিন্ন নদী ও ক্যানেল দিয়ে বের হয়ে যায়। অর্থাৎ বছরে প্রায় ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ঘনফুট পলি জমা হয় এই বিলে। এই পলি যদি ৩৬৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সমভাবে বিছিয়ে দেয়া হয় তা হলে প্রতি বছর এর উচ্চতা প্রায় ১ দশমিক ২৭ সেন্টিমিটার করে বৃদ্ধি পায়। বিলের শুষ্ক মৌসুমের অবস্থা পর্যালোচনার জন্য ১৯১০ সালে আরেকটি জরিপ পরিচালিত হয়। সেখানে দেখা যায়- বিলের আয়তন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। ১৯১৩ সালের জরিপে দেখা যায়-৩১ থেকে ৩৯ বর্গ কিলোমিটার এলাকা মাত্র সারা বছর পানির নিচে থাকে। ১৯৫০ সালের এপ্রিল মাসের দিকে বিলের মূল এলাকায় পানির গভীরতা মাপা হয় ২.৭৫ থেকে ৫.৪৯ মিটার। ১৯৮৭ সালের জরিপে দেখাযায়- শুষ্ক মৌসুমে শুধুমাত্র কিছু পুকুর আর ক্যানল ছাড়া বাঁকি অংশ প্রায় পুরোটাই শুকিয়ে যায়। চলনবিলের ভৌগোলিক অবস্থান ক্রমশ সংকুচিত হয়ে এখন ২৪ : ২৩ ডিগ্রী থেকে ২৪ : ৩৫ ডিগ্রী উত্তর এবং ৮৯ : ০৫ ডিগ্রী পুর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

’৮০ এর দশকেও  চলনবিলের বেশ কয়েকটি নদী ও খাল দিয়ে লঞ্চ, জাহাজ, স্পিড বোট অবাধে চলাচল করতো। পালতোলা নৌকা নিয়ে লোকেরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যাতায়াত করত। সংশ্লিষ্ট তথ্যমতে ১৯৩৫-৪০ সাল পর্যন্ত বিলে যতটুকু পানি থাকতো তাতে প্রচুর খাদ্য লোভে প্রতি বছর কার্তিক মাস হতে পৌষ-মাঘ মাস পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকার অতিথি পাখির আগমন হতো। যেমন বালিহাঁস, খয়েরা চকাচকি, কার্লিও, বুনো হাঁস, ছোট সারস, বড় সারস, হেরণ ত্রিশূল, বাটুল, ডাহুক, কানাকুয়া, ফেঁপী, বক, চখা, পানকৌড়ি, মাছরাঙা, ফিঙে, ইচাবক, লোহাডাং, নলকাক, বনমুরগি, চাকলা প্রভৃতি। এখন এসব পাখির আগমন কমে গেছে বিলাঞ্চলে পানি শূন্যতা আর পাখি শিকারীদের বাধাহীন তান্ডবে। =এক সময় মাছ, ঝিনুকমুক্তা, পাখি আর শস্যের ভান্ডার বলা হতো চলনবিলকে। তখন বিলের মধ্য দিয়ে নৌকাযোগে যেতে কোন রুই-কাতলার ঝাঁকের উপর নৌকা উঠলে মাছের প্রচন্ড লাফালাফিতে নৌকার মাঝি মাল্লারা আহতও হতো। নৌকা ভর্তি হয়ে যেত লাফিয়ে পড়া মাছে। প্রবীণেরা বলেন- মাছ আর পানি যেন ছিল সমান সমান। চলনবিল পাড়ের লোকেরা সারা বছর মাছ শিকার করে খেত আর জেলেরা করতো জীবিকা নির্বাহ সাচ্ছন্দ্যে। বিলের মিঠা পানিতে চৈত্র বৈশাখ মাসে দেশি প্রজাতির মাছ ডিম ছেড়ে বংশ বিস্তার করতো। বিলে পাওয়া যেত দেশী কৈ, রুই, কাতলা, মৃগেল, পাবদা, সিলং, বাটা, স্বরপুটি, গুজা, আইড়, বাচা, বাঁশপাতারি, খশল্লা, মেনি (নন্দই),টাকি,  বৌমাছ, গোঁচোই, মাড়গুর, শিং, গজার, শোল, বোয়াল, চিতল, বাইম, বেলে, চাঁদা, মলা, ঢেলা, টেংরা, কাকিলা, চিংড়ি, বাতাসীসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ প্রজনন ঘটাতো। এখন আর সেই অবস্থা নেই। মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের ফলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণি বিলুপ্ত  গয়ে যাচ্ছে।  পাশাপাশি কচ্ছপ, কুচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়াও হারিয়ে যাচ্ছে। বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় ৮০ প্রজাতির দেশি মাছ। আগে বর্ষা মৌসুম থেকে শুরু করে ৪/৫ মাস চলনবিলের মাছে শুটকি তৈরি করা হতো। বিল এলাকার সিংড়া, গুরুদাসপুর, রায়গঞ্জ, তাড়াশ, চাটমোহর, ফরিদপুর, ভাঙ্গুরা, আত্রাই উপজেলার বিভিন্ন স্থানে মাছ শুটকির জন্য স্থাপিত হতো শত শত চাতাল। হাজার হাজার নারী-পুরুষ শ্রমিক শুটকি চাতালে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতো। লাখ লাখ টাকার শুটকি মাছ চালান হতো দেশ-বিদেশে। সে সময়ে  মিঠা পানির এই শুটকি মাছের খুবই কদর ছিল। তখন প্রচুর মাছ পাওয়া যেত দামও ছিল কম। ইদানিং পানির সাথে মাছও কমে গেছে। শুটকি উৎপাদনও হচ্ছে অনেক কম। বিলের গরুত্বপুর্ণ জলাশয় আর আগের মত প্রকৃত মৎস্যজীবিদের দখলে নেই। বিলের ১১ টি উপজেলার আবাদযোগ্য বেশির ভাগ খাসজমি ও জলাশয় এখন প্রভাবশালীদের দখলে।

প্রাকৃতিক বিবর্তনের সাথে বিলে ব্যাপকহারে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ঘাসমারা বিষ ও নানা প্রকার রাসায়নিক পদার্থের যথেচ্ছ প্রয়োগে মাছসহ পরিবেশবান্ধব অনেক প্রাণি বিলুপ্ত হওয়ার পথে। পানি না থকায় রত্নগর্ভা এই বিলের ঝিনুক ও মুক্তার খনি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এক সময় শত শত ঝিনুক সংগ্রহকারী প্রতি বছর সহ¯্র কোটি টাকার মুক্তা সংগ্রহ করতো এবিলের গভীর জলাশয় থেকে। ঝিনুকের খোসা ব্যবহার হতো চুন তৈরির কাঁচামাল হিসাবে। এর বাইপ্রোডাক্ট আর ঝিনুকের গুগলি দিয়ে তৈরি হতো হাঁস-মুরগির খাদ্য। এসব ঝিনুক কাঁচামাল হিসাবে দূর- দূরান্তের ব্যাপারীরা ট্রাকভর্তি করে কিনে নিয়ে যেত নগদ মূল্যে ঝিনুক সংগ্রহকারীদের নিকট থেকে। এখন ঝিনুক অভাবে স্থানীয় চুন শিল্প ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।

অপরদিকে নদীগুলো নাব্যতাহীন হওয়ায় চলনবিলের মধ্যে নদী অববাহিকায় নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্ধ শতাধিক প্রসিদ্ধ বন্দর এখন অচল। এর মধ্যে পাবনার চাটমোহরের প্রাচীন শহর ও বন্দর, ভাঙ্গুড়ার মির্জাপুর বন্দর, হান্ডিয়ালের প্রাচীন শহর ও বন্দর, ফরিদপুরের প্রাচীন বনওয়ারী নগর ও বন্দর, ছাইখোলা বন্দর, নাটোরের জোনাইল বন্দর, বড়াইগ্রাম বন্দর, গুরুদাসপুরের চাঁচকৈড় বন্দর, সিংড়া বন্দর, নওগাঁ জেলার আত্রাই বন্দর, সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ উপজেলার পাঙ্গাসী বন্দর, ব্রহ্মগাছা বন্দর, ও সলঙ্গা বন্দর, তাড়াশের নওগাঁ বন্দর, উল্লাপাড়ার ঝিকিড়া পাট বন্দর এবং শাহজাদপুরের বাঘাবাড়ি বন্দরসহ নদী কেন্দ্রিক অসংখ্য হাট-বাজার প্রাণহীন হয়ে পড়েছে। অথচ এ সব বন্দরে একদা ভিড়ত মহাজনদের বড় বড় মালবাহী বজ্রা নৌকা ও জাহাজ। এসব এখন সুদুর অতীত। হারিয়ে গেছে পাল তোলা নৌকার বাহার, ঢেরা পিটিয়ে নৌকা বাইচের মেলা, ঐতিহ্যবাহী জারি, সারি ও ধুয়া গান।

চলনবিলের অধিকাংশ রাস্তা নির্মাণ হয়েছে পুর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ। যার ফলে প্রাকৃতিক নিয়মে উত্তর দিক থেকে আসা পানির প্রবাহে প্রবল বাধা পাওয়ায় বন্যাকালীন সময়ে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ চরম ব্যাহত হয়। বিলে অতিরিক্ত পলি জমে দ্রুত ভরাট হয়ে যাচ্ছে বিলের জলায়তন। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পরও কোন কোন এলাকায় সৃষ্টি হচ্ছে দীর্ঘ সময়ের জলাবদ্ধতা। ফলে এ অঞ্চলের মানুষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। জলাবদ্ধ এলাকার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয় সময়মত রবিশস্য চাষ করতে না পারায় আর প্রতিবদ্ধকতার কারণে পানি বিহীন এলাকার মৎস্যজীবিরা ক্ষতি গ্রস্থ হয় মাছের অভাবে। খাল-বিলে প্রয়োজনমত পানি না থাকায় এলাকার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয় সেচ সংকটে। ৩০-৩৫ বছর আগেও চলনবিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রায় সবগুলো নদ-নদীতে বছর জুড়েই ৫-১০ ফুট পানি থাকত। ফলে সারা বছরই নৌ-চলাচল করতে পারত। কিন্তু বছরের পর বছর পলি মাটি জমে এসব নদী ভরাট হয়ে গেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণ ছাড়াও মানবসৃষ্ট কারণে বিলের নদীগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, গত ২৫ বছরে চলনবিলের গভীরতা কমেছে ৩ থেকে ৫ ফুট। অন্যদিকে চলনবিলের ভিতর দিয়ে প্রবাহিত নদী ও খালগুলো ভরাট এবং নদীর উৎসমুখ বন্ধ করে দেয়ায় বিলের পানি শুকিয়ে যাওয়ায় চলন বিলের বুকে ও নদীর তলদেশে এখন চাষ হচ্ছে ধান, গম, ভুট্টা, সরিষা, সবজি, মশলাসহ  নানা জাতের ফসল। অধিকাংশ এলাকায় হচ্ছে ইরিগেশন্ যার প্রধান উপকরণ পানি।  বিলে পানি না থাকার কারণে সেচের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে গভীর ও অগভীর নলকূপ। ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যাপকহারে উত্তোলন করে চলছে ইরি-বোরো চাষবাদ। একদিকে বিলের নালা-খালে পানি নেই, তার উপর গভীর অগভীর নলক’প দিয়ে ব্যাপক হারে ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন করায় পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। খরা মৌসুমে ১৫-২০ ফুট গভীর গর্ত করে মাটি খুঁড়ে সেচ যন্ত্র প্রথিত করে ঝুঁকি নিয়ে সেচ দিতে হয়। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ নিচে নেমে যাচ্ছে। এ অবস্থার পরিবর্তন না হলে পানির স্তর আরো নিচে বা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এতে সেচকার্য বন্ধ হয়ে আধুনিক চাষাবাদ বন্ধ হয়ে যেতে পারে শস্য ভান্ডার চলনবিলের উর্বর জমিতে। ডেভেলপমেন্ট লিংক ফাউন্ডেশনের গবেষণা (২০০৯-১০) তথ্যমতে চলনবিল এলাকায় গভীর নলকুপ-৬ হাজার ৫০০ টি, অগভীর নলকূপ-৮০ হাজার, সাব মার্সিবল পাম্প প্রায় ৪ লাখ। এ সংখ্যা বেড়েই চলেছে। চলনবিল গবেষক ড. আবুল হোসেন বলেন- চলনবিল রক্ষায় প্রয়োজন পরিবেশগত বিপর্যয়ের মাত্রা ও বিস্তৃতি পর্যবেক্ষণ, সার্বিক অবস্থার মূল্যায়ন ও করণীয় নির্ধারণ। নদ-নদী খালগুলোকে তার স্বকীয়তায় ফিরিয়ে আনা। তাতে ফসল হবে, মাছ হবে, পাখি আসবে। চলনবিল রক্ষাসহ বিক্ষুব্ধ প্রকৃতির ভয়াবহ প্রতিক্রিয়ার কবল থেকে পরিত্রাণ পেতে অনতি বিলম্বে চলনবিল এলাকা ও এর উৎসমুখের সকল নদ-নদীর উপর নির্মিত ক্ষতিকর স্থাপনাসমূহ অপসারণ করতে হবে। বাস্তবভিত্তিক গবেষণালব্ধ দুরদর্শী ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প গ্রহন করতে হবে।

চলনবিল রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক এস এম মিজানুর রহমান বলেন- চলনবিল আর বিল নেই।  এটা ‘কোমায়’ চলে গেছে। বিলের মালিকানা ব্যক্তির অধীনে চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি কৌশলে রেকর্ড পরিবর্তন করে বিলের সিংহভাগ জমি নিজেদের নামে লিখিয়ে নিয়েছে।  তাদের চাওয়া আরো তাড়াতাড়ি বিল ভরাট হয়ে যাক। এ অবস্থা থেকে চলনবিলকে পুনরায় উজ্জীবিত করতে হবে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ইত্তেফাককে বলেন- চলনবিলকে রক্ষা করতে হলে চলনবিল অথরিটি প্রতিষ্ঠা করা দরকার এবং জন অংশ গ্রহনের ভিত্তিতে চলনবিলের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। #   



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১৩১৩ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই