তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১, বুধবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

আম উৎপাদনে দেশসেরা বরেন্দ্র অঞ্চল নওগাঁ

আম উৎপাদনে দেশসেরা বরেন্দ্র অঞ্চল নওগাঁ,চালান হচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানসহ বিদেশেও
[ভালুকা ডট কম : ০৫ জুন]
উত্তরের খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলের সীমান্তবর্তি জেলা নওগাঁ। মূলত ধান ও চাল উৎপাদনের জন্য নওগাঁ জেলা বিখ্যাত হলেও গত কয়েক বছর যাবত সুমিষ্ট আম উৎপাদনেও দেশসেরার তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এই নওগাঁ জেলা। বর্তমানে আমের দ্বিতীয় রাজ্য হিসেবে সুনাম কুড়িয়ে আসছে নওগাঁ। ইতিমধ্যেই বাজারে আসতে শুরু করেছে নওগাঁর সুমিষ্ট আম। কিন্তু কিছু অসাধু ব্যবসায়ীরা নওগাঁর সুমিষ্ট আমকে রাজশাহী কিংবা চাপাইয়ের নাম ভাঙ্গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে এমনকি বিদেশেও চালান করে প্রতারনা করে আসছে।

এই জেলাতে যেসব শিল্পকারখানা গড়ে উঠেছে তার অধিকাংশই কৃষিভিত্তিক। কৃষিই নওগাঁর অর্থনৈতিক কর্মকা-ের মূল চাবিকাঠি। কাটারিভোগ, কালোজিরা, জিরাশাইল, মিনিকেট চালসহ উন্নত মানের চালের জন্য এই জেলা বিশেষ ভাবে পরিচিত। এ ছাড়া ধান চাষ নির্ভর এই জেলা দেশের সিংহভাগ চালের জোগান দেয়। কিন্তু অল্প দিনেই ধানের এই রাজ্যে ঘটেছে সুমিষ্ট আম চাষের বিপ্লব। গত ১০বছরে ধানের পাশাপাশি আম চাষাবাদের ফলে পাল্টে গেছে এই এলাকার চিত্র। ভারতীয় সীমান্তবর্তি পোরশা, সাপাহার, নিয়ামতপুর, পত্নীতলা, ধামইরহাট উপজেলাতে বাণিজ্যিক ভাবে গড়ে উঠেছে শত শত বিঘা জমিতে আমের বাগান। এছাড়াও জেলা সদর, বদলগাছী, মান্দাসহ অন্যান্য উপজেলাতেও গড়ে উঠছে আমের বাগান।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানা গেছে, চলতি মৌসুমে আমের সম্ভাব্য চাষ হয়েছে ২৫ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে। জেলায় আম্রপালি ৭৬ শতাংশ, বারি-৪ আম ৬ শতাংশ, আশ্বিনা ৭ শতাংশ, ফজলি ৩শতাংশ, ল্যাংড়া ৩ শতাংশ, ক্ষিরসাপাত ২ শতাংশ, গৌড়মতি ১ শতাংশ, কাটিমন ১ শতাংশ ও অন্যান্য জাতের ১ শতাংশ জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে।

আমচাষীদের দাবি, পূর্বে আম চাষে জেলার ভারতঘেষা সীমান্তবর্তি উপজেলা পোরশা ও সাপাহার বেশি পরিচিত ছিলো। যে দিকে দৃষ্টি যেতো শুধুই ধু ধু ফাঁকা মাঠই চোখে পড়তো। অন্যান্য আবাদের চেয়ে আম চাষ বেশি লাভজনক হওয়ার কারণে ২০০৯ সালের পর থেকে আস্তে আস্তে ধান চাষের পাশাপাশি আম বাগান গড়ে উঠতে শুরু করে। একসময় নওগাঁর এই অঞ্চলের মানুষরাও আম বলতে পার্শ্ববর্তি চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম খুঁজতো। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে এখন নওগাঁর বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটিতে জন্ম নেওয়া আম কিনতে দেশ-বিদেশের মানুষ আসে এই এলাকায়।

সাপাহার উপজেলার প্রান্তিক আমচাষী নওশাদ আলী জানান, গত বছর দুই বছর বয়সের আম বাগান থেকে চার লাখ টাকার আম বিক্রি করেছি। এবার নতুন করে আবার ১৫বিঘা জমি লিজ নিয়ে আম বাগান তৈরি করেছি। আল্লাহর রহমতে এবার ফল ভালো ধরেছে। গত বছর এক মণ আম ২৫০০ থেকে ৩০০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মণ ধানের দাম ওঠে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। সেখানে এক মণ আম হাজারের নিচে নেই। কমবেশি সব জায়গায় এখন আমের বাগান গড়ে উঠেছে। সারাদেশের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এসে আমবাগান কিনে নিচ্ছেন আর ফলনও হচ্ছে ব্যাপক। গত মৌসুমে আমের মণ চার হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। তাই সবাই এখন আমের দিকেই ঝুঁকছেন। নওগাঁয় প্রায় ছোট-বড় ২৫০টি আমের আড়ৎ রয়েছে। গত বছর এই আড়তগুলোর অধীনে কাজ করছেন প্রায় ১০হাজার মৌসুমি শ্রমিক। একজন শ্রমিক প্রতিদিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেছেন।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফরিদ খান জানান, নওগাঁর অর্থনীতির চাকা বরেন্দ্র অঞ্চলের আমে ঘুরছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসে প্রতিদিন শত শত ট্রাক আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। গত মৌসুমে নওগাঁর আমচাষীরা প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি করেছেন। এতে চাষীদের ঘরে এসেছে স্বচ্ছলতা, তেমনি মৌসুমজুড়ে হয়েছে হাজারো মানুষের কাজের সুযোগ।

তিনি আরো বলেন, একসময় যাদের কোনো কাজ ছিল না, তারা এখন কেউ বাগান পাহারা দিচ্ছে, কেউ বাগানের পরিচর্যা করছে। আবার কেউ ভ্যান-ট্রলি চালিয়ে আম পরিবহনের কাজ করছে। কেউ আড়ৎ খুলে বসছেন, কেউ প্যাকেটিংয়ের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। প্রতিদিন হাজার হাজার কেজি আম কুরিয়ারে করে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। এ ছাড়া আম বাজারজাত করতে ধানের খড়, চটের বস্তা ও ঝুড়ির কদর বেড়ে গেছে কয়েক গুণ।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোশাররফ হোসেন বলেন, নওগাঁ একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত এলাকা। বর্তমানে নওগাঁয় আম চাষ হচ্ছে বেশি। বিশেষ করে বিভিন্ন কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী ও শিক্ষিত বেকার যুবকরা জমি ইজারা নিয়ে এ অঞ্চলে আমের বাগান তৈরি করছেন। এ জেলায় আম্রপলি বা বারি-৩ জাতের আমের ফলন বেশি হচ্ছে। যে হারে দিন দিন নওগাঁয় আম চাষের আবাদ বাড়ছে, উৎপাদনের ধারা বৃদ্ধি রাখলে দেশের অর্থনীতিতে আম বিশেষ অবদান রাখবে। জেলায় অন্তত ৪৬হাজার হেক্টর জমিতে আম চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে জেলায় দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জেলার সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয় সীমান্তবর্তি সাপাহার উপজেলায় ১লাখ ১৯ হাজার ১৬০ টন, পোরশায় ১ লাখ ১৫ হাজার ১৯৯ টন, পত্নীতলায় ১ লাখ ১১ হাজার টন। চলতি মৌসুমে ২৫০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও একই জমিতে ধান ও আম চাষ হচ্ছে। যার কারণে প্রতিবছরই আমের উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সাপাহার আম আড়ৎ মালিক সমিতির আহ্বায়ক গোলাম মোস্তফা জানান, গত ১০বছরে সাপাহারে আম বাজার ঘিরে ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা আম কিনতে আসেন। তাদের পছন্দমতো আড়তে অবস্থান করে ধিরস্থিরভাবে সরাসরি কৃষকের বাগান থেকে আম কিনতে পারেন। এমন সুষ্ঠু বাজার ব্যবস্থা বাংলাদেশে আর কোনো জেলাতে নেই। সে কারণেই আমের বৃহৎ বাজার তৈরি হয়েছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আমচাষী রেদোয়ানুর রহমান মুন জানান, জেলার সাপাহার উপজেলায় আমের নতুন রাজধানী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। বর্তমানে এখানকার চাষীরা আম চাষে এগিয়ে থাকলেও লাভের দিক থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছেন। কারণ এখানে আমের কোনো সংরক্ষণাগার নেই। জুন মাসের মাঝামাঝি সময়ে আম্রপালি বাজারে উঠলেও তখন চাষীরা ভালো দাম পান না। যদিও জুলাই মাসের শেষে আমের দাম অনেক বেশি হয় বাজারে। তাই চাষীরা যদি এক-দেড় মাস আম সংরক্ষণ করতে পারতেন, তাহলে অনেক লাভবান হতেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক সামছুল ওদাদুদ বলেন নওগাঁ জেলা বরেন্দ্র অঞ্চলভুক্ত এলাকা। জেলার পোরশা, সাপাহার, ও পত্নীতলা উপজেলায় বেশি আমবাগান গড়ে উঠেছে। বরেন্দ্র এলাকায় পানির পরিমাণ কম আবার সেচ-সুবিধাও নেই। তাই মাটির বৈশিষ্ট্যের কারণেই আমের প্রচুর ফলন হয়। এখন ফলনের পরিমাণে জেলার আম বাগানগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের চেয়েও বেশি হচ্ছে। জেলায় নতুন নতুন বাগান হচ্ছে এবং ফলনও বাড়ছে। গত বছর জেলায় আম উৎপাদন হয়েছিল ২লাখ ৭২ হাজার মেট্টিক টন তার তুলনায় চলতি বছর ৩লাখ ২০হাজার মেট্টিক টন আম বাজারজাতের আশা করা হচ্ছে। জেলার প্রধান আম হচ্ছে সুমিষ্ট আম্রপালি। এই আমের ওপর ভিত্তি করেই নওগাঁ ব্যান্ডিং হয়েছে।  আম্রপালি নামটি হাইব্রিড জাতের আম। উত্তর ভারতের হার্টথ্রব আম দুশেহেরি হলো এই আম্রপালির মা, আর দক্ষিণ ভারতের সুপার স্টার হিরো নিলম জাতের আম হলো এই আমের পিতা।

জেলা প্রশাসক মো: হারুন-অর-রশীদ বলেন, জেলায় বেড়েই চলেছে আমের বাগান। বর্তমানে নওগাঁ থেকে সীমিত পরিমাণে আম বিভিন্ন দেশে রফতানি হচ্ছে। তা ছাড়া ২০২০সাল থেকে বারি আম-৩ বা আম্রপালি বিখ্যাত কোম্পানি ওয়ালমার্টের চাহিদার তালিকায় রয়েছে। নওগাঁ থেকে আম আমদানিকারক দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, সুইডেন, সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ওমান। রফতানিযোগ্য আমের উৎপাদন বৃদ্ধি ও সঠিক ভাবে বাজারজাত করার সকল প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন সম্পন্ন করেছে বলেও তিনি জানান।#



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

কৃষি/শিল্প বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১৩১৯ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই