তারিখ : ০৯ ডিসেম্বর ২০২১, বৃহস্পতিবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

শ্রীপুরের কর্মকর্তাকে দিতে হয় স্কুল উন্নয়নের টাকার ভাগ

শ্রীপুরের শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিতে হয় স্কুল উন্নয়নের টাকার ভাগ
[ভালুকা ডট কম : ০৮ জুন]
বিদ্যালয়ের রুটিন মেরামত, ক্ষুদ্র মেরামত, প্রাক প্রাথমিক, প্লেয়িং এক্সোসরিস, স্লিপ বরাদ্ধের টাকার একটি ভাগ দিতে হয় গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে। এছাড়াও বিদ্যলয় পরিদর্শনে গেলেও তাকে টাকার একটি অংক খামে ভরে খুঁশি করতে হয় শিক্ষকদের।

শিক্ষকরা বিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করতেও শিক্ষা কর্মকর্তার নির্দ্দিষ্ট করা দোকান থেকেই অধিক দামে কিনতে হয়। অন্যথায় শিক্ষকদের নানাভাবে হয়রানী ও হুমকী দেয়ার অভিযোগ উঠেছে এই শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। যদিও প্রশাসনিক জটিলতা এড়াতে শিক্ষকদের অধিকাংশই মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। নিরবে নিভৃতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে খুশি করতে সরকারী বরাদ্ধের একটি অংশ তার হাতে তুলে দিচ্ছেন।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, শ্রীপুরে নবজাতীয়করণ কৃত বিদ্যালয় নিয়ে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৬। প্রতি অর্থবছর রুটিন মেরামত, ক্ষুদ্র মেরামত, প্রাক প্রাথমিক, প্লেয়িং এক্সোসরিস খাতে উল্লেখিত বিদ্যালয়গুলোতে সরকারী বরাদ্ধের বিভিন্ন অর্থ আসে। প্রতি অর্থবছর এর অংক ছাড়িয়ে যায় কোটি টাকার উপর।

বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের সাথে কথা বলে জানান যায়, গুটিকয়েক বিদ্যালয়ে সরকারী বরাদ্ধের কাজ হলেও অধিকাংশই উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেই লুটপাট চলে। নজরদারীর অভাবে অধিকাংশ বরাদ্ধের টাকা চলে যায় শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের পকেটে। বিশেষ করে করোনার এই সময়ে বিদ্যালয় বন্ধ থাকায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারী বরাদ্ধে। চলতি অর্থবছরে উপজেলার ৫৭টি বিদ্যালয়ে ক্ষুদ্র মেরামতে ২লাখ টাকা করে মোট ১কোটি ১৪লাখ টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। প্রতিটি বিদ্যালয় এই চেক গ্রহন করতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে ১০হাজার টাকা করে দিতে হয়। অন্যথায় নানা ধরনের জটিলতার ভয় দেখানো হয় শিক্ষকদের। উক্ত টাকা গ্রহন করতে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাজের পূর্বেই বিভিন্ন বিল ভাউচার দিয়ে কাজ হয়েছে মর্মে অঙ্গীকার দিতে হয়। এছাড়াও কাজের পূর্বেই উপজেলা প্রকৌশল অফিস কাজ হয়েছে মর্মে প্রত্যয়ন দিয়ে থাকে। পরে চেক প্রাপ্তির পর তা চলে যায় শিক্ষকদের পকেটে। এর একটি ভাগও যায় শিক্ষা কর্মকর্তার পকেটে। এছাড়াও গত অর্থবছরে করোনার বন্ধের মধ্যেও পুরো টাকাই চলে গেছে শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পকেটে। যেখানে ভূয়া বিল ভাউচারে কোটি টাকার উপরে ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে যৎসামান্য।

প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রতি অর্থবছর শিক্ষার্থী অনুযায়ী ৭০হাজার থেকে ১লাখ টাকা করে স্লিপ বরাদ্ধের অর্থ দেয়া হয়। স্লিপের এ টাকা গ্রহন করতে শিক্ষা কর্মকর্তাকে ৫হাজার টাকা করে দিতে হয়। চলতি অর্থবছর করোনাকালীন এই সময়ে স্বাস্থ্য সামগ্রী কিনতে স্লিপ বরাদ্ধ হতে ৩৫হাজার টাকা করে বেধে দেয়া হয়। এই স্বাস্থ্য সামগ্রী কিনতে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা সকল শিক্ষকদের নিয়ে সভা করে তার  নির্দ্দিষ্ট করা দোকান থেকে এসব মালামাল ক্রয় করতে বলেন। শিক্ষা কর্মকর্তাকে খুশি করতে শিক্ষকরা এসব দোকান থেকে অধিক টাকা দিয়ে মালামাল সংগ্রহ করেন।

চলতি অর্থবছরে উপজেলার ৯টি বিদ্যালয়ে প্লেয়িং এক্সোসরিস কিনতে প্রতি বিদ্যালয়কে ১লাখ৫০হাজার টাকা করে মোট ১৩লাখ ৫০হাজার টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। কিন্তু নিজে লাভবান হতে শিক্ষা কর্মকর্তা বিদ্যালয়গুলোতে উক্ত সামগ্রী কিনতে নগদ টাকা না দিয়ে নিজে মাওনা চৌরাস্তার সুমন ষ্টিল হতে বিদ্যালয়গুলোতে  মালামাল গুলো সরবরাহ করেন। এতে শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যরা প্রতিবাদে সরব হয়েছেন। এছাড়াও বিদ্যালয়ে কমিটি গঠন, শিক্ষকদের উচ্চতর স্কেল প্রাপ্তি,বেতন ভাতার জটিলতা সহ নানা কাজে তাকে টাকা দিতে হয়। কিছুদিন আগে ইএফটিএন করতে প্রতি শিক্ষকদের কাছ হতে ৫শত টাকা করে উপজেলায় কর্মরত ১হাজার শিক্ষকদের কাছ হতে  হাতিয়ে নিয়েছেন মোটা অংকের টাকা।

প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান নিজে অনলাইনে তার নিজ নামে “হাসান ইনক্লোশন এডুকেশন”নামে একটি পেইজ খুলেছেন। সেখানে প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থীদের সহায়তার নামে অনলাইন কার্যক্রম শুরু করেছেন। তিনি এই পেইজটি বিভিন্ন শিক্ষকদের মাধ্যমে সংযুক্ত করে পরিচালনা করছেন। অভিযোগ রয়েছে প্রতিবন্ধি শিক্ষার্থী দেখিয়ে সরকারী, দেশী ও বিদেশী সহায়তা এনে লুটপাট করছেন। একজন শিক্ষা কর্মকর্তার এহেন কাজে সামাজিক ভাবে নানা প্রশ্ন তৈরী হয়েছে।

শ্রীপুরের নগরহাওলা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত ৭বছর ধরে পরিচালনা পর্ষদের কোন কমিটি নেই। অভিযোগ রয়েছে কামরুল হাসানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় চলে উক্ত বিদ্যালয়টি। নিয়ম না মেনেই উক্ত বিদ্যালয়ে প্রতিঅর্থবছরে মোটা অংকের টাকা বরাদ্ধ দেয়া হয়। সেখান থেকেই তিনি তার একটি অংশ বুঝে নেন। অথচ সরকারী নিয়ম অনুযায়ী কমিটি গঠনে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকলেও এবিদ্যালয়ের বেলায় তিনি নিরব ভূমিকায়।

ধনুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এসএমসির সদস্য তোফাজ্জল হোসেন বলেন, এমন অরাজকতা আর সহ্য করা যাচ্ছে না। শিক্ষা কর্মকর্তা সবাইকে পুতুলে পরিনত করেছেন। তিনি যা বলছেন তা এখন সহ্য করতে হচ্ছে। সবই তিনি করছেন নিজে লাভবান হওয়ার জন্য। সরকার টাকা বরাদ্ব দেয়ার পর আমরা খেলার সামগ্রী কিনতে চেয়েছিলাম, তিনি তা না করে এখন নিজেই ঠিকাদারের ভূমিকায় রয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি বলেন, বিদ্যালয়ে সরকারী বরাদ্ধের টাকা আনতেও একটি অংশ শিক্ষা কর্মকর্তাকে দিতে হয়। এটা খুবই দুঃখজনক। এখানে কার টাকা কাকে দিব। টাকা না দেয়ায় তার বিদ্যালয়ের চেক এখনো প্রধান শিক্ষক আনতে পারেননি। অধিকাংশ চেকই তিনি আটকিয়ে রেখেছেন।

শ্রীপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুল হাসান বিগত ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৭সালে শ্রীপুরে যোগদান করেন। পরে উপজেলার প্রতিটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইড বই কিনতে বাধ্য করায় তার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রীট পিটিশন দায়ের করেন এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক। উচ্চ আদালত সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা সহ এই শিক্ষাকর্তার বিরুদ্ধে রুল জারী করলে তিনি ২০১৮সালে প্রশিক্ষনের নামে দেশ ত্যাগ করেন। এক বছর পর ২০১৯ সালে দেশে ফিরে ফের তিনি পূর্বের কর্মস্থলে যোগদান করেন। এর আগে গাজীপুর সদর উপজেলার কর্মরত থাকা কালীন তার বিরুদ্ধে অনিয়ম দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ সভা করেছিল সেখানকার শিক্ষক। তার অনিয়ম দুর্নীতি গাজীপুরে এখন ওপেন সিক্রেট।

নিজের বিরুদ্ধে উঠা বিভিন্ন অভিযোগ অস্বীকার করে প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা  কামরুল হাসান বলেন, বিভিন্ন প্রাথমিক শিক্ষকরা নানাভাবে তার বিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্ধ চান। কিন্তু আমরা ধারাবাহিকতা বজায়ের স্বার্থে তা দিতে না পারায় হয়তো অনেকে ক্ষিপ্ত হয়ে এমন অভিযোগ করছেন। এসবের কোন সত্যতা নেই।

এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, তার কাছে এখনো এমন কোন অভিযোগ আসেনি। তবে তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন বলে জানান।#




সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

শিক্ষাঙ্গন বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ১৩২৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই