তারিখ : ১৯ জুন ২০১৮, মঙ্গলবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

চিকিৎসা বিজ্ঞান বনাম সামাজিক কুসংস্কার

চিকিৎসা বিজ্ঞান বনাম সামাজিক কুসংস্কার
[ভালুকা ডট কম : ২৯ জুন]
পৃথিবীতে ৬০০ কোটিরও বেশী মানুষ। প্রত্যেকের রয়েছে আলাদা বিশ্বাস। এই বিশ্বাস যদি বিজ্ঞান ভিত্তিক হয় তখন উহাকে জ্ঞান বলে, যেমন পাঁচ এর সাথে দুই যোগ করলে যোগফল সাত হয়।  আর যদি বিজ্ঞান ভিত্তিক না হয় তাহলে সেটাকে কুসংস্কার বলে, যেমন জোড়া লাগানো কলা খেলে যমজ সন্তান হয় যার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। কুসংস্কার একটি ভয়ানক সামাজিক ব্যাধি।

মানুষের মৌলিক চাহিদা খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও শিক্ষা। খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান এগুলি বস্তুগত জিনিস। তাই এগুলিতে কুসংস্কার তুলনামূলক ভাবে কিছুটা কম। শিক্ষা, এটাও আধুনিকতার সাথেই তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানেরও অনেক উৎকর্ষসাধন হয়েছে। কিন্তু এরপরও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে পৃথিবীর সব দেশেই কমবেশি কুসংস্কার বিদ্যমান। এসব কুসংস্কারের পিছনে রয়েছে সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কারন। কারও শিক্ষা না থাকলে সে প্রাচীন অবৈজ্ঞানিক  চিন্তাধারায় অটল থাকতে চায়। আর শিক্ষিত হলে তার মধ্যে চিন্তা ও আচরণের মধ্যে পরিবর্তন আসে। কেহ যদি আর্থিকভাবে অসচ্ছল হয় তাহলেও সে ঝাঁড়ফুঁক, পানিপড়া, মাদুলি, গাছের শিকড় ইত্যাদি সস্তা অপচিকিৎসা পছন্দ করে। অর্থাভাবে আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা অনেকসময় তার নাগালের বাইরে থাকে। যেমন একজন গরীব হার্টের রোগী তার হার্টের  ব্যয়বহুল অপারেশনটি করাতে পারেনা। তখন তিনি ভন্ড ও প্রতারকদের অপচিকিৎসার দ্বারস্থ হন। আর্থিক ও স্বাস্থ্যগতভাবে বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হন। পরবর্তিতে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসারও সুযোগ হারিয়ে ফেলেন। অনেকসময় এসব অপচিকিৎসার কারনে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটে।

আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের যুগে এসেও কিছু কুসংস্কার বহুল প্রচলিত। ইদানীং ফেসবুকেও প্রচুর চিকিৎসা সংক্রান্ত কুসংস্কার দ্রুত ভাইরাল হতে দেখা যায়। প্রতারকরা ফেসবুকে এসব ভুয়া আই.ডি নাম্বার বা পেইজ খুলে। তাদের প্রোফাইলে ইন্টারনেট থেকে মেডিকেলের ছাত্রছাত্রী ও ডাক্তারদের গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলানো ছবি সংগ্রহ করে আপলোড করে। এসব ভুয়া আই.ডি ও পেইজে দুনিয়ার যতসব গাঁজাখুরি চিকিৎসা পদ্ধতির বর্ণনা দেওয়া থাকে। আমি এমন এক ভুয়া পেইজে "ধুতুরা পাতার রস খেলে দীর্ঘদিন যৌবন ধরে রাখা যায়" পোস্ট করতেও দেখেছি। সাধারণ মানুষ না বুঝে এগুলিতে লাখেলাখে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে থাকেন।

নীচে কিছু বহুল প্রচলিত কুসংস্কার তুলে ধরা হলো:-
১। শিশুর জন্মগত ত্রুটি মায়ের দোষে নয়। 
২। মায়ের দোষে মেয়ে সন্তান হয় না।
৩। স্বামী স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপ এক হলে সমস্যা হয়না।
৪। প্যারালাইসিস কারও অভিশাপে নয়।
৫। ঝাঁড়ফুঁকে প্যারালাইসিস ভাল হয়না।
৬। জুতার গন্ধ নিলে মৃগী রোগী ভাল হয়না।
৭। মাথায় পানি ঢাললে খিঁচুনি ভাল হয়না।
৮। মাথা ব্যাথা হলেই চশমার প্রয়োজন নাই।
৯। সব মাথা ব্যথা হাইপারটেনশন নয়।
১০। কোমর ব্যথা মানেই কিডনি রোগ নয়।
১১। মা বাইন মাছ খাইলে শিশুর পেট মোচড়ায় না।
১২। শিশুর কাপড় ধোয়ে চিপলে পেট ব্যথা হয়না।
১৩। শিশুর ঘন ঘন প্রস্রাব মানে শিশুডায়াবেটিস নয়।
১৪। গর্ভের শিশু বড় হলে সবসময় সিজার লাগেনা।
১৫। বুকের ব্যথা মানেই হার্ট এট্যাক নয়।
১৬। বেশি মিষ্টি খেলেই ডায়াবেটিস হয় না।
১৭। ডায়রিয়ায় মা স্যালাইন খেলে শিশুর কোন উপকার নাই।
১৮। ডায়রিয়ায় শিশু স্যালাইন খেলে নিউমোনিয়া হয়না।
১৯। দাঁত তুললে চোখ ও ব্রেইনের ক্ষতি হয় না।
২০। গর্ভাবস্থায় পানি বেশি খেলে শরীরে পানি আসেনা।
২১। টক বা মিষ্টি খাবার খেলে ক্ষত বা ঘা পাকে না।
২২। পোড়া রোগী ডিম বা দুধ খেলে ক্ষতস্থান সাদা হয়না।
২৩। শিশুর শরীরের সব লালচে দানা হাম নয়।
২৪। শিশুর হাত পায়ের সব ব্যথাই বাতজ্বর নয়।
২৫। মানসিক রোগ মানেই শয়তান বা ভুতের আছর না। 
২৬। বাচ্চা না হওয়া মানেই নারীর বন্ধ্যাত্ব রোগ নয়।
২৭। সব পেটে ব্যথাই গ্যাস্ট্রিক বা পেপটিক আলসার নয়।
২৮। জোড়া লাগানো ফল খেলে জমজ সন্তান  হয়না।
২৯। হাম, টাইফয়েড ও জলবসন্তে সব খাবার খাওয়া যায়।
৩০। মাথার চুল কাটার সাথে ব্রেইন বা চোখের সম্পর্ক নাই।
৩১। জ্বরে গায়ে কাপড় বেশি দিলে জ্বর আরও বাড়ে।
৩২। গায়েবী মুসলমানি ছেলে শিশুর একটি জন্মগত ত্রুটি।
৩৩। দুধ ও আনারস একত্রে খেলে কেউ মরেনা।
৩৪। রোগীকে আখের রস খাওয়ালে জণ্ডিস ভাল হয়না।
৩৫। আদা যৌবন ধরে রাখার ওষুধ না।
৩৬। দুধ দিয়ে মুখমণ্ডল ধুইলে ফর্শা হয়না। 
৩৭। ধুতুরা পাতার রস খেলে যৌবন ধরে রাখা যায়না।
৩৮। বালিশের নিচে রসুনের কোয়া রাখলে যৌন শক্তি বাড়েনা।
৩৯। কাজল-কালিতে চোখের ভ্রু কালো হয়না।
৪০। কাঁচা ও ভাজা উভয় লবণই রক্তচাপ বাড়ায়।
৪১। গর্ভফুল সিদ্ধ করলে জন্মগত শ্বাসকষ্ট কমেনা।
৪২। স্থায়ীদাঁত উঠতে দুধদাঁত ইঁদুরের গর্তে ফেলতে হয়না।
৪৩। সব খাবারেই সবার এলার্জি হয়না।
৪৪। দামী এন্টিবায়োটিক মানেই বেশী পার্শপ্রতিক্রিয়া নয়।
৪৫। কারও প্রস্রাবের প্রবাহ ডান-বাম যেকোনো দিকে হতে পারে।
৪৬। শিশুর জিহ্বায় ছত্রাক হলে মধু দিলে সারেনা।
৪৭। ভেরেণ্ডা গাছের বাকলে বমি কমে না।
৪৮। সরিষার তেল সর্দী কাশি কমায় না।
৪৯। জন্মগত ত্রুটির অপারেশন করা যায়।
৫০। কুইয়া, বতা ও মাইট্যা জণ্ডিস বলতে কোন শব্দ মেডিকেল ডিকশনারিতে নাই।

অবৈজ্ঞানিক, কুসংস্কার ও ভুল তথ্য প্রচার প্রসার করে আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে পিছনের দিকে ঠেলে দিয়ে জাতির স্বাস্থ্যের সর্বনাশ করা ছাড়া আর কিছুই নয়। সমাজ থেকে এসব কুসংস্কার দূর করতে হলে প্রাচীন কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধ্যান ধারনার পরিবর্তন আনতে হবে। প্রিন্ট, ইলেক্ট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলোতে লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দেওয়ার আগে দেখতে হবে চিকিৎসা বিষয়ক প্রবন্ধটির লেখক তিনি একজন চিকিৎসক কিনা। আমরা সবাই যদি এ ব্যাপারে আর একটু সচেতন হই তাহলেই সমাজ থেকে চিকিৎসা সংক্রান্ত এসব কুসংস্কার দূর হবে। আমাদের স্বাস্থ্য আরও সুরক্ষিত থাকবে।#






সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

কলাম বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ২০৪ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই