তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৪, মঙ্গলবার

সংবাদ শিরোনাম

বিস্তারিত বিষয়

ভালুকায় ছত্রাকে শিম নষ্ট,দিশেহারা কৃষক

গরু বেচার টেহায় শিমুইট (শিম) ক্ষেত করছি  সব পইচ্যা শেষ
ভালুকায় ছত্রাকে পঁচে কোটি কোটি টাকার শিম নষ্ট দিশেহারা শত শত কৃষক
[ভালুকা ডট কম : ২৬ জানুয়ারী]
“গরু বেইচ্যা ৩০ হাজার টেহা খরচ কইরা ৭ কাডা জমিত শিমুইট ক্ষেত করছিলাম, হারা ক্ষেত জুইরা শিমুইট গুলা পইচ্যা পরতাছে আড ন্যায়া বেচনের জো নাই, পুত নাতি লইয়্যা হারা বছর খাইয়াম কি আর নাত্নির কলেজের টেহাই দেম কোনহানতে আল্লাই জানে”।

সরজমিন ২৪ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার ভালুকার কাচিনা ইউনিয়নের তালাব গ্রামে গেলে ক্ষেতে ছত্রাকে পঁচে যাওয়া শিম দেখিয়ে কথাগুলি বলছিলেন ওই গ্রামের মৃত সিদ্দিক আলীর বিধবা স্ত্রী জোসনা খাতুন (৫৫)। তিনি আক্ষেপ করে বলেন প্রায় ১৪ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে, ছেলের বউ ও নাতি নাত্নিদের নিয়ে খেয়ে না খেয়ে বেঁচে রয়েছেন। ছেলেরা অন্যের বাড়ী দিন মজুরী খাটে। নাত্নি সুনিয়া (১৭) পাশর্বর্তী শ্রীপুর উপজেলার আব্দুল আউয়াল কলেজে দ্বাদশ শ্রেণীতে অধ্যয়নরত।কলেজে আসা যাওয়ার জন্য  প্রতিদিন তাকে ১০০ টাকা দিতে হয়। আরেক নাতি সাব্বির (১৪) নবম শ্রেণীতে লেখাপড়া করছেন। নিজেদের বাড়ী সহ সামান্য জমি রয়েছে। দুই বছরের জন্য ৭ কাঠা জমি বর্গা নিয়ে শিম চাষ করেছেন। ওই ক্ষেত থেকে অন্য আরেকজন চাষী গত বছর দুইলাখ টাকার শিম বিক্রি করেছিলেন। এ বছর তারা ওই জমি দুই বছরের জন্য বর্গা নিয়ে প্রথমবার শিম চাষ করেন। ফলনও ভাল হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শৈত প্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারনে ডাটা সহ ছড়ার শিম গুলিতে সাদা ছত্রাক আক্রান্ত হয়ে শিম পঁচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।  প্রচন্ড শৈত প্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারনে ছত্রাক আক্রান্ত হয়ে ভালুকার কাচিনা ইউনিয়নের তালাব গ্রামে ক্ষেতের শিম পঁচে মাটিতে ঝরে পরায় কোটি কোটি টাকা লোকসানের মুখে পরেছে ওই গ্রামের শত শত কৃষক। স্থানীয় দোকান হতে বালাই নাশক দিয়েও কোন প্রতিকার পাচ্ছেননা বলে কৃষকরা জানান। অনেকই অভিযোগ করে বলেন এ অবস্থায় তারা কৃষি বিভাগের লোকজন না পাওয়ায় স্থানীয় কীটনাশক ডিলারদের পরামর্শ নিয়ে ক্ষেতে ঔষধ দিতেছেন। সবজির গ্রাম নামে পরিচিত ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায় প্রতি বাড়ীর চারপাশে বাঁশের মাচার উপর সবুজ শীম গাছে উপরের দিকে বোটায় ফুটে আছে নীল সাদা ফুল ফাকে ফাকে ঝুলে রয়েছে শিমের ছড়া। শিমের গায়ে লেগে আছে সাদা ছত্রাক। ছত্রাক আক্রান্ত শিম পচেঁ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

কৃষক নজরুল বি এস সি জানান তিনি প্রায় ৮ কাঠা জমিতে শীম চাষ করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে শৈত প্রবাহ ও ঘন কুয়াশার কারনে শিমে ছত্রাক আক্রান্ত হয়ে শীম ব্যাপক হারে পচেঁ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। প্রতিশেদক হিসেবে এমিষ্টার টব ও অন্যান্য ছত্রাকনাশক দিয়েও কোন ফল হয়নি। গত বছর তিনি আড়াই লাখ টাকার শিম বিক্রি করেছিলেন। এ বছর তিনি ও অন্যান্য চাষীরা খরচের টাকা তুলতে পারবেন কিনা সন্দেহ রয়েছে। কৃবিভাগের লোকজন তেমন একটা আসেননা। বিভিন্ন কীটনাশক কোম্পানীর লোকজন এলাকায় আসে তাদের পরামর্শে আক্রান্ত ক্ষেতে ঔষধ দিয়ে থাকেন।

কৃষক অজুফা, আব্দুর রহিম, জিতেন্দ্র, ঈমান আলী, মুন্তাজ আলী, আব্দুল গফুর, নজরুল, বিল্লাল, খোরশেদ আলম জানান তাদের গ্রামে এমন কোন কৃষক নেই যার ক্ষেতের শিম ছত্রাকে আক্রান্ত হয়নি। কাজল মিয়া জানান কষ্টের ফলানো শিম পঁেচ নষ্ট হওয়ায় তারা অনেকে সর্বশান্ত হচ্ছেন। আগামীতে শিম চাষে অনেকেই মুখ ফিড়িয়ে নিবেন বলে তার ধারনা। মাছে ভাতে বাঙ্গালীর রসনা নিবৃত্তে দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় শিমের ভর্তা ভাজি মাছের ঝুলে শিম ধনী গরীব সকলের প্রিয় খাবার হিসেবে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। মৌশুমের শুরুতে দেড় দুইশত  টাকা কেজি দরে অনেকে সখ করে শিম কিনে খেয়ে থাকেন। যদিও বর্তমানে ৬০ টাকা কেজি স্থানীয় বাজারে শিম বিক্রি হচ্ছে।

তিনি জানান তালাব গ্রামে প্রায় ৭/৮শর মত শিম চাষী রয়েছে। বাড়ীর আঙ্গিনা সহ যে দিকে চোখ যায় সব জায়গাতেই ফুটে আছে শিমের ফুল। প্রায় ২০ বছর যাবৎ এই গ্রামের কৃষকদের উৎপাদিত শীম ও বিভিন্ন সবজি সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত,ওমান,দোবাই সহ কয়েকটি দেশে রপ্তানী করে কোটি কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জণ করে ওই গ্রামের ৮শতাধিক কৃষক পরিবারের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। শুধু তালাব গ্রামেই নয় হবিরবাড়ী,পাড়াগাঁও, মল্লিকবাড়ী নয়নপুর, পাঁচগাঁও, পানিভান্ডা, কাদিগড় এলাকায় প্রচুর শিমের আবাদ হয়।

কুঁড়ি হতে শীম বিক্রয়োপযোগী হওয়া পর্যন্ত কম পক্ষে ২০ দিন সময় লাগে। এ বছর ছড়ায় শীমের বয়স ১৪/১৫ দিন হতেই ছত্রাক আক্রান্ত সাদা দাগ পরে পঁচন ধরতে শুরু করে। বিক্রয়োপযোগী হওয়ার পূর্বেই শীমগুলি মাটিতে ঝরে পরে ছড়া শূন্য হয়ে যায়। তালাব বাজারের একজন সার ও কীটনাশক ব্যবসায়ী জানান ওই গ্রামে হাজারের উপরে কৃষক রয়েছেন যারা প্রতি বছর শীমের আবাদ করে একেক জন ২ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করে থাকেন। এতে ১০/১৫ কোটি টাকার শিম প্রতি বছর কৃষকরা বিক্রি করে থাকেন। এবছর শীম ক্ষেতে রোগ বালাই বেশী দেখা দেয়ায় চাষীরা ব্যপক লোকসানের সম্মুখীন হয়েছেন। তালাব চৌরাস্তা বাজারের রুপা ট্রেডার্সের মালিক রাকিব জানান তিনি এলাকার কৃষকদের নিকট হতে শীম ক্রয় করে ঢাকায় রপ্তানীকারকদের কাছে বিক্রি করেন। যা সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, দুবাই সহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানী হওয়ায় এ গ্রামের কৃষকদের ঘরে আসে কোটি কোটি টাকা। অন্যান্য বছর প্রতিদিন ৪/৫ ট্রাক শীম প্যাকেটজাত করে রপ্তানীর জন্য ঢাকায় পাঠাতেন। কৃষকের শীম নষ্ট হওয়ার কারনে এ বছর এখনও শীম পাঠাতে পারছেন না। তার আশংকা যদি শীম ক্ষেতে রোগ নিরাময় সম্ভব না হয় তা হলে ওই গ্রামের হাজারো কৃষক কোটি কোটি টাকার লোকসানের ভাগিদার হবেন।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা জেসমিন জাহান জানান চলতি মৌসুমে ভালুকায় ৩৮০ হেক্টর জমিতে শিম চাষ হয়েছে। শৈতপ্রবাহ ও ঘনকুয়াশার কারনে জাব পোকার আক্রমন ও ছত্রাক রোগে আক্রান্ত হওয়ায় কিছু কিছু কৃষকের শিম নষ্ট হচ্ছে। রোগ প্রতিরোধে ছত্রাক নাশক ও কীটশাক ব্যবহারের জন্য তারা কৃষকদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।#



সতর্কীকরণ

সতর্কীকরণ : কলাম বিভাগটি ব্যাক্তির স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য,আমরা বিশ্বাস করি ব্যাক্তির কথা বলার পূর্ণ স্বাধীনতায় তাই কলাম বিভাগের লিখা সমূহ এবং যে কোন প্রকারের মন্তব্যর জন্য ভালুকা ডট কম কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় । প্রত্যেক ব্যাক্তি তার নিজ দ্বায়ীত্বে তার মন্তব্য বা লিখা প্রকাশের জন্য কর্তৃপক্ষ কে দিচ্ছেন ।

কমেন্ট

ভালুকা বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

অনলাইন জরিপ

  • ভালুকা ডট কম এর নতুন কাজ আপনার কাছে ভাল লাগছে ?
    ভোট দিয়েছেন ৮৯০৬ জন
    হ্যাঁ
    না
    মন্তব্য নেই